যৌনতা নিয়ে কথা বলা জরুরী

যৌনতা নিয়ে কথা বলা জরুরী

যৌনতা শব্দটা শুনলেই আমাদের কপাল কুঁচকে যায়। মনের ভিতর একটা নোংরা ভাব চলে আসে। যেন জীবনেও আমরা এই ব্যাপারটার মধ্য দিয়ে যাইনি। এটা কি কোন সভ্য মানুষের সাথে যায় নাকি? অথচ আমরা কেউ এই ব্যাপারটার বাইরে না। সব মানুষের ভিতরেই যৌন চাহিদা বিদ্যমান। কিন্তু আমরা এই বিষয়ে শুনতে বা বলতে রাজি না। কেন?

যৌনতা নিয়ে যদি আমাদের এতো রাখ ঢাক না থাকতো, যদি মানুষ এই বিষয় টা নিয়ে সহজে কারো সাথে আলাপ করতে পারত, হয়তো আমাদের পারিবারিক জিবনের অনেক সমস্যার সহজ সমাধান হতো। কোন এক অজানা কারনে আমাদের সমাজে যৌনতা শব্দটাই একটা বাজে ব্যাপার। অথচ আরও আগে ইতিহাস যদি জানা যায় তবে সেই সময়ে এই ব্যাপারটা নিয়ে মানুষ খুবি যত্নবান ছিল। সব বাদ দেই , শুধু পরিবারের ভিতরে চোখ রাখি।

স্বামী স্ত্রীর ভিতরেও যৌনতা নিয়ে খোলাখুলি কথা হয়না। এমন অনেক পরিচিত আছে আমার যাদের বিবাহিত জীবন ভালবাসায় ভরপুর কিন্তু নিজেদের শারীরিক চাহিদা নিয়ে তারা কাথা বলে না। অতঃপর অনেক সুখেও কিছুটা অবসাদ ঢুকে পরে। বুঝতে হবে যে যৌন চাহিদা আমাদের আর বাকি সব চাহিদার মতই স্বাভাবিক এবং জরুরি। আমি যদি আমার চাহিদা বা আমার সঙ্গীর চাহিদা সম্পর্কে ধারণা না রাখি তাহলে সেই চাহিদা কিভাবে পূরণ করা সম্ভব? নিজের এবং সঙ্গীর মানসিক এবং শারীরিক অবসাদ দূর করে আত্মতৃপ্তি পাবার এবং দেবার জন্যই, যৌনতা নিয়ে সঙ্গীর সাথে কথা বলা একশত ভাগ জরুরি।

একটা সময় আমি নিজেও এইসব নিয়ে কথা বলতাম না। আসলে এই বিষয় নিয়ে কথা বলার মতো কেউ আমার আশেপাশে ছিলোনা। কিন্তু আমার ভিতরে কৌতূহল ছিল অনেক।

আমাদের সমাজ ব্যাবস্থায় ছেলেরা এই বিষয়ে কিছু কথা বললেও, মেয়েরা একদম চুপ থাকে। দুঃখ জনক হলেও সত্যি যে আমাদের মেয়েরা সব সময় নিজের আগে পারা প্রতিবেশীর কথা ভাবে। এবং এইভাবেই একসময় তারা মানসিক অস্থিরতার মুখে পরে যায়। আমরা যখন বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করি তখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে এটাও একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এটা মানতে হবে।

আমাদের সমাজে এখন পরকীয়া ব্যাপারটা খুব চোখে পরছে। পরকীয়া সম্পর্কে ছেলে এবং মেয়ে উভয়েই সমান ভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে তাদের ব্যাক্তিগত অস্থিরতার কারনে। এদের কে আমরা খুব সহজেই বলে ফেলি চরিত্রহীন। কিন্তু কখনো কি আমরা ভেবে দেখেছি ঠিক কেন, কখন বা কিভাবে স্বামী বা স্ত্রী এই সম্পর্কে জরিয়ে গেলেন? অনেকেই আছেন যারা একে অপরকে খুব ভালবাসে কিন্তু তারা তাদের সঙ্গীর সাথে শারীরিক সম্পর্কে সুখি নয়, আবার এই বিষয়ে কথাও বলেন না একে অপরের সঙ্গে। এবং সময়ের সাথে এই যৌন অপূর্ণতা তাদের ভিতরে মানসিক দূরত্ব তৈরি করে ফেলে। এবং আরও পরে গিয়ে তা তিক্ততার সৃষ্টি করে সম্পর্ক ভাঙ্গন ঘটায়। অথচ দুজন সঙ্গীর একজনও যদি এই বিষয়ে কথা বলার মতো সাহস বা ইচ্ছা পোষণ করতো তাহলে হয়তো অন্যরকম কিছু হতে পারতো।

আপনি আপনার সঙ্গীকে যদি বুঝাতে সক্ষম হন আপনার চাহিদা কি , কি ভালো লাগে আর কি ভালো লাগেনা এবং সেই সাথে তার ভালো লাগা মন্দ লাগা টুকুও যদি বুঝে নিতে পারেন তাহলে আমার মতে আপনার মতো সুখি আর কেউ হবেনা। যৌন তৃপ্তি আপনার শরীর এবং মন কে প্রশান্ত করে, আপনাকে রিল্যাক্স রাখে, হরমনের তারতম্মের কারনে মন ফুরফুরা থাকে। যা আপনাকে কর্মক্ষেত্রে এবং পারিবারিক জীবনেও সফলতা এনে দিবে। এবং তাতে করে পরকিয়ার ঝুকি টাও কমে যায়।

এইবার দেখা যাক পরিবারের বাইরে। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হয়েও আজকাল প্রায় অধিকাংশ মানুষ কিন্তু শারীরিক সম্পর্কে থাকেন। আমাদের সমাজ ব্যাবস্থা এই বিষয়টা না মানলেও এইরকম সম্পর্কের কোন অভাব নাই। কিন্তু তারাও যদি একটু খোলাখুলি সঙ্গীর সাথে কথা বলার মতো সাহস রাখে তাহলে অনেক অনিচ্ছাকৃত ভুল এমন কি ধর্ষণের ব্যাপারটাও কিছুটা কমে যেতো। যৌনতা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলার প্রাকটিস আমাদের কিশোর কিশোরী দের মধ্যে থাকলে অযথা কৌতূহলের কারনে তারা  অরক্ষিত শারীরিক মিলনের ঝুকি নিতো না। আমাদের দেশে অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং অবিবাহিত মেয়েদের গর্ভপাত করানো হয় সব থেকে বেশি, যা কিনা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এই বেশিরভাগ ছেলে মেয়েরাই শুধু মাত্র একটা নিসিদ্ধ জিনিসের প্রতি তিব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে যৌন কাজ সম্পন্ন করে থাকে। অথচ আমরা যদি একটু খোলামেলা কথা বলে এই কৌতূহল মিটিয়ে দেই তাহল তারা ঝুকি মুক্ত থাকে।  অন্তত সবার এইটুকু জানা উচিত যে নিরাপদ যৌনমিলন কি এবং কেন জারুরি। এই কাজ টা অবশ্যই  সৌন্দর্য, শালীনতা বজায় রেখেই করা সম্ভব এবং করা উচিত।

একটা সময় আমি নিজেও এইসব নিয়ে কথা বলতাম না। আসলে এই বিষয় নিয়ে কথা বলার মতো কেউ আমার আশেপাশে ছিলোনা। কিন্তু আমার ভিতরে কৌতূহল ছিল অনেক। পরে বন্ধুদের সাথে আমি নিজেই প্রসঙ্গ আসলে বিষয় টা শুরু করতাম। তখন লক্ষ্য করলাম শুরু করে দিলেই ওরাও সুন্দর কথা বলে, জানতে চায়, নিজেদের সমস্যা, অভিজ্ঞতা শেয়ার করে। আমার সহকর্মীরা অনেকেই আমাকে ভাবে আমর মুখে কিছুই আটকায়না। কিন্তু এই সহকর্মীদের কেই আমি দেখেছি আমার কথায় মজা নিতে, আগ্রহ নিয়ে শুনতে। এমন নারী সহকর্মী আমি পেয়েছি যারা রেগুলার পর্ণ দেখে। পর্ণ না দেখলে তার ভালো উত্তেজনা আসেনা কিন্তু এই কথা তার স্বামী জানেনা।

একজন নারী সহকর্মী ছিলেন যিনি তীব্র যৌন চাহিদা অনুভব করেন কিন্তু স্বামীর সাথে তিনি সেক্স বলতে গেলে করেনই না। জানতে চেয়েছিলাম কেন? খুবি লজ্জা পাচ্ছিলেন এই বিষয়ে কথা বলতে কিন্তু পরে তিনি নিজেকে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। তিনি বলেন তার তীব্র যৌনাকাঙ্ক্ষা হয় কিন্তু স্বামীর সাথে সেক্স করতে তার ভালো লাগেনা। আমি জানতে চাইলাম কেন? বলল, তার স্বামী তার যা ভালো লাগে তা করেনা এবং বেশির ভাগ সময় তার তৃপ্তি বা অর্গাজম হয় না। তাই তার আর স্বামীর সাথে সেক্স করতে ইচ্ছা করেনা। তখন আমি তার কাছে জানতে চাইলাম যে সে তার স্বামী কে এই বিষয় টা বলেছে কিনা, সে উত্তর দিলো না, সে জানায়নি। আবার জানতে চাইলাম কেন জানায়নি? সে উত্তর দিলো এই সব কি বলবো, বুঝার হলে তো বুঝত আগেই। আমি অবাক। আমি তাকে বললাম তুমি না বললে সে কিভাবে বুঝবে? তোমার স্বামী কি মাইন্ড রিডার? সে বোকার মতো আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি আমার এই সহকর্মী কে দেখছি সে সবসময় অস্থিরতায় ভুগে। সারাক্ষন খুজে বেরায় অন্য কাউকে, যার সাথে সে তার মনের মতো করে সময় ব্যয় করবে, নিজের চাহিদা পূরণ করবে। আমি তাকে বুঝালাম যে, তোমার কথা বলতে হবে, নিজের ভালো লাগা মন্দ লাগা স্বামীর সাথে শেয়ার করতেই হবে। তুমি যদি তাকে না বল যে তোমার কি প্রয়োজন তাহলে সে সেইটা পূরণ করবে কিভাবে? আর এই যে তুমি নিজের ভালো লাগেনা ভেবে স্বামীর সাথে সেক্স করনা, ভেবে দেখেছ কখনো তার চাহিদা টা কিভাবে সে পূরণ করবে? তুমিও যেমন অস্থিরতায় ভুগতেছো, সেও অবশ্যই এই অস্থিরতায় ভুগতেছে। কোন একদিন সে ঠিক অন্য কাউকে খুজে নিবে আর এই তুমি নিজেই তখন বলবা যে সে তোমাকে ঠকিয়েছে। কিন্তু ভাবো ভুল টা কার? তখন আমর সহকর্মী আমাকে বলেছিল, হ্যা, তুমি ঠিক বলেছ, এইভাবে তো আমি কখনো ভাবিনাই। আমাকে সে কথা দিয়েছিল যে সে তার স্বামীর সাথে এই বিষয়ে খোলামেলা হবে। আমি জানিনা সে সত্যি সেটা করতে পেরেছিল কিনা।

কিন্তু একবার ভাবুন তো, এই যে না বলতে পারা ব্যাপারটা, তাও আবার স্বামীর সাথেই এইটা কিভাবে, কোথায় থেকে আসলো আমাদের ভিতরে? আমরা শুধু লোকের মুখে মুখে শুনতেই থাকি আর খবরের কাগজে পরতেই থাকি – অবৈধ সম্পর্ক আর পরকীয়া প্রেমের গল্প। তারপর ভ্রু কুঁচকে, মুখ বাঁকা করে তাদের চৌদ্দগুষ্ঠি কে গালিগালাজ করি। ভাবি না কোথা থেকে,কেন, কখন, কিভাবে এর শুরু। সব কিছুর মুলে এই না বলতে পারা, আমাদের ভিত্তিহীন কিছু নিয়ম, আর আমাদের কাঁচের মতো ঠুনকো সামাজিক মূল্যবোধ। খবরের কাগজ খুল্লেই প্রায় দেখা যায়, স্কুল পড়ুয়া কিশোর কিশোরী প্রেম করে পালিয়েছে অথবা ১৪ বছরের মেয়ে গর্ভবতী। এমন খবর এই ২০২১ এও কেন আমাদের দেখতে হয়? দেখতে হয় কারন আমরা আমাদের সন্তান্দের সাথে কথা বলিনা প্রেম, ভালবাসা বা যৌনতা নিয়ে। যদি আমরা কথা বলতাম তাহলে ঐ ১৪ বছরের মেয়ে জানত সেক্স এবং নিরাপদ সেক্স কি, তখন হয়তো তার অতিরক্ত কৌতূহল কিছুটা লাগামে থাকতো। আর তা না হলেও অন্তত অন্তঃসত্ত্বা হয়ে খবরের কাগজের হেডলাইন হতে হতোনা।

ঐ ঘর পালানো কিশোর কিশোরী যদি জানতো যে ভালবাসা অন্যায় না, পড়া লেখা শেষ করা পর্যন্ত তাদের অভিবাবক তাদের এই সম্পর্ক মেলামেশা মেনে নিবে তাহলে হয়তো তারা ঘর পালিয়ে জীবন বাজি  রাখতোনা। অকালে নষ্ট হয়ে যেতনা এই সব তরুন প্রাণ। আমাদের শিক্ষিত হতে হবে, বই পুস্তকের শিক্ষিত না, সত্যিকারের শিক্ষিত। ২০২১ এ দাড়িয়ে ১৮০০ শতাব্দীর চিন্তা, নিয়ম নিয়ে পথ চলা যায় না। আমাদের কে লজ্জা ফেলে কথা বলতে হবে, শুধু যৌনতা নয়, সব বিষয়েই নিজেদের অভিমত প্রকাশ করতে হবে পার্টনার এবং অন্যদের কাছেও।

লিখেছেন
নাজিয়া জ্যামি

খুব বেশীদিন হয়নি আমি লেখালেখি শুরু করেছি। মনে মনে অনেক কিছু লিখে ফেলি, কিন্তু কাগজে কলমে সহজে হয়ে উঠেনি। আমি এক সন্তানের মা এবং কিছুদিন হল বাংলাদেশের বাইরে বসবাস করছি।

মন্তব্য করুন

মন্তব্যগুলো
লিখেছেন নাজিয়া জ্যামি