বাংলাদেশের নারী অধিকার

বাংলাদেশের নারী অধিকার

নানা প্রতিকূলতা, চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে চলছে নারীর অগ্রযাত্রা। বাংলাদেশের রক্ষণশীল সমাজ নারীকে মজুরি বিহীন গার্হস্থ্য শ্রমে ব্যস্ত রাখতে চেয়েছে চিরকাল। এর মূল প্রথিত আছে পুরুষতান্ত্রিকতার সমাজ দর্শনে। কিন্তু যে নারী ধৈর্য, সংগ্রাম, সাহস আর দৃঢ়তার অন্যরূপ মানব সভ্যতার সূতিকাগার, তাকে অবহেলা করে আত্ম-পরিচয়ের নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট তথা সর্বক্ষেত্রে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার রয়েছে হাজার বছরের সুদীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস।

 ১২০৪ সালে, বাংলায় মুসলিমদের আগমনের পর ব্যাপক ধর্মান্তর ও ধর্মান্তরিত বাঙালি নারীরা মুসলিম আইন অনুযায়ী সম্পত্তি, দেনমোহর, বিবাহবিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধিকার পায়।কিন্তু ১৪০০ সাল নাগাদ ফিরোজ শাহ তুঘলক ও সিকান্দার আলী লোদী কর্তৃক বাঙালি মুসলিম নারীর স্বাধীনতা হ্রাস করে বোরখা ও ঢাকা গাড়ি ছাড়া মেয়েদের চলাচল নিষিদ্ধ করে অন্তঃপুরে জেনানা মহলে মেয়েদের অবস্থান করতে বাধ্য করা হয় ।

১৮২৯ সালে, রাজা রামমোহন রায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত হলে বিধবা নারীরা বেঁচে থাকার অধিকার লাভ করেন। 

১৯৩৯ সালে, ব্রিটিশ- ভারতে মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন বলবৎ এ নারীরা সামান্য হলেও দাম্পত্য স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৬১, ১৯৭৪ ও ২০০৯ সালে এই আইন সংস্কার করে জেন্ডার সংবেদনশীলতায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়েছে।

১৯৮০ সালে, যৌতুক প্রথার মত ভয়াবহ সামাজিক সমস্যার নিরসনকল্পে যৌতুক নিরোধ আইন প্রণয়ন করে নারীর দাম্পত্য সুরক্ষা দানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

১৯৮৫ সালে, বিবাহবিচ্ছেদ,দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, মোহরানা, ভরণপোষণ ও সন্তানের অভিভাবকত্ব নিষ্পত্তি কল্পে পারিবারিক আদালত প্রতিষ্ঠা করে নারীর দাম্পত্য অধিকার নিশ্চিত করা হয়।

২০০০ সালে, নারী ও কন্যার প্রতি যৌন সহিংসতা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ আইন প্রণয়ন করলে নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হয়।

২০০২ সালে, এসিড অপরাধ দমন আইন পাস হলে নারীকে অ্যাসিডে ঝলসানোর মতো বর্বরতা অনেকাংশে কমে আসে।

২০১০ সালে, পরিবারের কোন নারী বা শিশু সদস্যের ওপর শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিক ক্ষতির সুরক্ষায় পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন পাশ হয়।

২০১২ সালে, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের মাধ্যমে এর শিকার নারীর সুরক্ষা ও অধিকার বাস্তবায়ন ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণ করা হয়। একই বছরে নারীর সম্ভ্রম সুরক্ষায় পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন  প্রণয়ন করা হয়েছিল।

বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রের অনেক অনুচ্ছেদ বিশেষ করে ২৬, ২৭, ২৮, ২৯ এ নারী-পুরুষের সমঅধিকারের কথা বলা আছে। ২৮ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে, “রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে সমঅধিকার, সমসুযোগ ইত্যাদি বিষয়ে সংবিধান অনেকাংশেই নিরব। ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়া প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তারপর থেকে বেগম জিয়া এবং শেখ হাসিনা যুগপতভাবে অদ্যাবধি প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ক্ষমতায় রয়েছেন।

২০১৩ সালে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন নারী। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা অধিষ্ঠিত থাকলেও বৃত্ত ভেঙে সমাজের সব ক্ষেত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নারীর অগ্রগতির যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে তা বাস্তবে পরিণত করে নারীকে পূর্ণমাত্রায় বিকশিত করার পথ উন্মুক্ত হচ্ছে না। জাতিসংঘের হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট-২০১৪ মোতাবেক বাংলাদেশের লিঙ্গ বৈষম্য সূচক ১০৭তম। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০১৩ অনুযায়ী বাংলাদেশের বৈশ্বিক জেন্ডার গ্যাপ ১৪৪ এর মধ্যে ৭৫তম। শ্রমক্ষেত্রে নারীর অর্জন ৫৮% কিন্তু অর্থনৈতিক অবদানে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে নারী অস্বীকৃত।

কোথায় নেই বাংলার নারী?

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রথম নারী শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনে নারীদের ছিল অগ্রণী ভূমিকা। ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে সম্ভ্রম খুইয়েছেন দুইলক্ষ নারী। মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতার স্বীকৃতি স্বরূপ বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত হয়েছেন তারামন বিবি ও সেতারা বেগম। বাংলাদেশের সংবিধান রচনার অন্যতম সদস্য ছিলেন বেগম রাজিয়া বানু। ক্রিকেটের এশিয়া কাপ বিজয়ী নারী দল। এভারেস্টের চূড়ায় প্রথম লাল-সবুজ পতাকায় স্থাপন করেছেন নিশাত মজুমদার। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম ক্ষেত্র পোশাক শিল্পে কর্মরত আছেন ৯০ শতাংশ নারী। এত কিছুর পরও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, লিঙ্গসমতা, অর্থনৈতিক সুযোগ, রাজনীতিতে সমান প্রতিনিধিত্ব, বাল্যবিবাহ, প্রজনন অধিকার, শিক্ষা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নারীর অধিকার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পদে পদে। বৈষম্য বিধাতা প্রদত্ত নয় বরং তাঁর সৃষ্টির দ্বারা সৃষ্ট। জন্ম থেকেই একজন কন্যাশিশুর বড় হওয়ার সাথে সাথে তার বৈষম্যের ফর্দটাও লম্বা হতে থাকে। দক্ষ ও মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও বঞ্চিত হয় নারী। যে নারীর স্নেহ-মমতায় বেঁচে থাকে পুরুষ তারাই ধর্ষণ, গণধর্ষণের মতো বর্বরতায় তাকে হত্যা করতেও পিছপা হয় না। এমন জঘন্য কর্মকাণ্ডের পরেও দূর্ভাগ্যজনক ভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীর বিরুদ্ধেই অপপ্রচার চালানো হয়। এসব অপরাধে মামলা হয় খুবই কম। মামলার তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে সমালোচনা থাকলেও অনেক আসামি গ্রেফতার হচ্ছে। সংখ্যায় কম হলেও অনেক মামলার আইনানুগ নিস্পত্তিও হচ্ছে তথাপি নারীর প্রতি সহিংসতা উল্লেখযোগ্য হারে কমছে না। যে কারণে নারী নির্যাতন এখনও এদেশে নারী অগ্রগতির এক অন্যতম অন্তরায়। এর বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে শুধু আইনি তৎপরতায় এসব বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

এ অবস্থায় নারী অধিকারের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের কন্ঠে নারীকেই বলতে হবে, “ভগিনী গন! চক্ষু রগড়াইয়া জাগিয়া উঠুন!বুক ঠুকিয়া বলো মা! আমরা পশু নই; বলো কন্যে! আমরা জড়োয়া অলংকার রূপে লোহার সিন্দুকে অবরুদ্ধ থাকিবার বস্তূ না; সকলে সমস্বরে বলো-আমরা মানুষ!”

লিখেছেন
নীলকণ্ঠ

আমি নীলকন্ঠ! বিজ্ঞানে বিশ্বাসী। কারণ বিজ্ঞান সত্য খুঁজে পাবার চেষ্টায় লিপ্ত। আমি শারিরীকভাবে একটি লিঙ্গের প্রতিনিধি, কিন্তু মানসিক ভাবে আমি দুটি লিঙ্গেরই প্রতিনিধিত্ব করি।

মন্তব্য করুন

লিখেছেন নীলকণ্ঠ