বর্তমান বিশ্বে বিরোধী মতামতকে কোনঠাসা করতে,ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়াতে,রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল,আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া কিংবা স্রেফ মজা করার জন্যও নানাবিধ ভূয়া খবর বা তথ্য ছড়ানো হয়ে থাকে।এ প্রবনতা এখন এতটাই বেড়ে গেছে যে,বিশ্বাসের জায়গাটাই সংকীর্ণ গেছে।সত্য আর বস্তুনিষ্ঠতার চাইতে গুজব বা আবেগতাড়িত খবর গুলোর প্রতি বেশী আকৃষ্ট হচ্ছে মানুষ।
কিভাবে ছড়ায় এবং তার নেতিবাচক প্রভাব
ভূয়া খবর বা গুজব ছড়ায় বাতাসের বেগে।তবে এর উৎসমূ্লটিও থাকে বায়বীয়।কাণ্ডজ্ঞানহীনতা,অতি আবেগ কিংবা অজ্ঞতাকে পুঁজি করে অনলাইনে বিস্তার ঘটে ভূয়া খবরের।সার্চ ইঞ্জিন,ওয়েব সাইট কিংবা সোসাল মিডিয়া হয়ে এসব খবর হ্যামিলনের বাঁশী ওয়ালার মতোই আকর্ষন করে ডিজিটাল সিটিজেনদের।এগুলি ছড়ায় মূলত নকল ওয়েব সাইট,সোশাল মিডিয়ার নকল প্রোফাইল থেকে।একই ভাবে ছড়ায় অপরিচিত,অবিশ্বস্ত লিংক থেকেও।তাই আসল বা নকল চিনতে না পারলে ভূয়া বা গুজবের খপ্পরে পড়ার শংকা থেকেই যায়।
সংবাদ অতিরঞ্জিত হয়ে ভাইরাল হওয়ায় রামুর বৌদ্ধ মঠে ভাংচুর,শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে আইনশৃংখলা বাহিনীর অভিযানে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি,নাসির নগরে হিন্দু মন্দিরে হামলা এমনকি মানুষ পিটিয়ে বা পুড়িয়ে হত্যা করার মত ঘটনাও ঘটেছে।সত্যটা জানার পর অনেক দেরি হয়ে যায় যখন এই মিথ্যাচারের দুঃখজনক পরিণতির ক্ষত সারিয়ে তোলার কোন সুযোগ থাকেনা।তাই যে কোন আবেগপ্রবন বা সংবেদনশীল বিষয়ে পরিবেশিত সংবাদ মিথ্যা বা বিকৃত কিনা তা সর্বাগ্রে চিহ্নিত করা অত্যাবশ্যক।
কিন্তু কিভাবে?
মানুষের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার সাথে সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক,ইউটিউব, ভুয়া ওয়েবসাইট এবং গনমাধ্যমে মিথ্যা,বিকৃত বা খন্ডিত সংবাদ পরিবেশন করে ইউজারদের লাইক,কমেন্ট ও শেয়ারের কারণে ভাইরাল হয় ভুয়া খবর।
এক গবেষনায় দেখা গেছে সাধারণত গুজব বা ভূয়া খবর ছড়ানোর পদ্ধতি ৬ টি।
- ছবিতে কারসাজি
- বানোয়াট ভিডিও
- সত্যের বিকৃত উপস্থাপন
- নকল ও কাল্পনিক বিশেষজ্ঞের ভূয়া বক্তব্য
- গণমাধ্যমের অপব্যবহার এবং
- তথ্য বিকৃতি।
যে ভাবে চেনা যাবে খবরটি ভূয়াঃ- ভূয়া তথ্য সব সময়ই একটু থ্রিল ধর্মী হয়।শব্দে-ছবিতে থাকে চমক।বেশ সম্মোহনী হয়ে থাকে।প্রথমেই কয়েকটি প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হবে।কে? কি? কেন? কখন?
তাই এ খবর বা ছবি কোথা থেকে প্রচার হচ্ছে তা দেখে নেয়াটাই জরুরী।কেননা এসব খবর বা ছবি কেবল বিভ্রান্তই করে না, বিপদও ডেকে আনে।অনলাইন জীবনে ওয়েবসাইট ভিজিটের ক্ষেত্রে যেসব ওয়েব এর ঠিকানায় http এর পরে ‘s’ থাকেনা সেগুলো সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ,এছাড়া মূল ওয়েবসাইটের ডোমেইন নামের বানান খুবই গুরুত্বপুর্ণ।তাই নামের বানান এদিক ওদিক করে নকল ওয়েবসাইট তৈরী করা হয়।এক্ষেত্রে http://whois.icann.org/en এই ঠিকানায় প্রবেশ করে ওয়েবসাইটটি কবে তৈরী হয়েছে,কে তৈরী করেছে সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়।
তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভূয়া তথ্য-উপাত্ত চেনাটা বেশ কঠিন। এ ক্ষেত্রে শিরোনামে বিভ্রান্ত না হয়ে খবরের উৎস যাচাই করতে হবে। ফেসবুকের ক্ষেত্রে ভেরিফায়েড পেজ ছাড়াও প্রোফাইলের ছবি বা নেচারও গুরুত্বপূর্ণ।একটু বিচক্ষণ হলেই নকল প্রোফাইল সনাক্ত করা সম্ভব।দ্বিধান্বিত হলে ফেসবুকে ফ্যাক্ট চেকার গ্রুপ https://www.facebook.com/bdfactcheck অথবা ওয়েবসাইট https://bdfactcheck.com কিংবা https://www.jaachai.com এর সাহায্য ভূয়া চিহ্নিত করা সম্ভব।আবারhttps://twitter.com/StopFakingNews থেকে টুইটারে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া খবর বা মিথ্যা তথ্য সম্পর্কেও জানা যায়।
নকল ছবি বা ভিডিও চিহ্নিত করনঃ- যদি কোন ছবির আকার ছোট ও রেজুলেশন কম হয় তবে তা নকল হওয়ার সুযোগ বেশী।এখানে কিছু সাধারন জ্ঞান কাজে লাগাতে হবে।মূলত ভূয়া ছবিগুলো বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই মূল ছবিকে ক্রপড,এডিট ও মিরর করে ছবির ক্যাপশন পরিবর্তনের মাধ্যমে তা নকল হিসাবে ছড়ানো হয়।তাই যাচাই এর ক্ষেত্রে অবশ্যই ছবিটির প্রকৃত তারিখ,স্থান ও এটি প্রকাশের প্রেক্ষাপট জানা জরুরি।
গুগল রিভার্স সার্চ এর মাধ্যমে ছবির শুদ্ধতা যাচাই করতে হবে।এডোবি ফটোশপের মাধ্যমে বিশেষ বার্তাবাহী ছবিটি সম্পাদন করা হয়েছে কিনা তা জানতে গুগল ইমেজ রিভার্স সার্চ অপশনটি ব্যবহার করতে হবে।এক্ষেত্রে https://images.google.com এই ঠিকানায় গিয়ে ছবি বা ছবির লিংকটি সার্চ মেনুতে ড্রপ করতে হবে।অনেক সময় ছবিতে মিরর ইফেক্ট ব্যবহার করেও ধাঁধাঁর জন্ম দেয়া হয়।এমন হলে টিন আই https://www.tineye.com থেকেও সহযোগীতা নেয়া যাবে।
ভূয়া খবর বা তথ্য চিহ্নিত করাঃ- ফেসবুকের মতো বিভিন্ন অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিমতকে তথ্য হিসাবে উপস্থাপন করে ভুল শিরোনামে বানোয়াট খবর প্রচার করা হয়ে থাকে।তাই খবরের ক্ষেত্রে যে গনমাধ্যমের বরাত দিয়ে বা লোগো ব্যবহার করে কোন সংবাদ বা ছবি অনলাইনে প্রচার হচ্ছে তার সত্যতা নিশ্চিত হতে অবশ্যই সেই সংবাদ মাধ্যমের মূল ওয়েবসাইটে যেতে হবে।সাম্প্রতিক সময়ে বাংলা ট্রিবিউন,বিবিসি বাংলা ও প্রথম আলো এমন নকল বাজদের কবলে পড়ে।তাই এমন অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য আবেগতাড়িত খবর কেবল একাধিক সূত্রের মাধ্যমে জেনে তারপরই গ্রহন-বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়া উত্তম।খবরের ক্ষেত্রে অবশ্যই নিজের কমনসেন্স,তথ্যসূত্রের বিশ্বাসযোগ্যতার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।খবরের বর্ণনা বাদ দিয়ে যদি বিষয়বস্তুকে প্রাধান্য দেয়া হয় তবে তা বিনা দ্বিধায় গ্রহন না করাই শ্রেয়।আন্তর্জাতিক খবর যাচাই এর ক্ষেত্রে গুগল ছাড়াও https://www.snopes.com লিংক ব্যবহারেও ভালো ফল পাওয়া যাবে।
সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে ছবির মতোই প্রচুর ফেইক ভিডিও সামনে আসে।যেখানে কোন ব্যক্তি,স্থান, ঘটনা্,সময় ইত্যাদি নিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়।ভিডিওটি ভূয়া কিনা তা বোঝার জন্য ভালো করে দেখে এর ডিটেইলস এ নজর দেয়া উচিৎ।সবচেয়ে সতর্কভাবে দেখতে হবে এর ছায়া,প্রতিবিম্ব এবং শার্পনেস এর পরিমান।এ ছাড়া পুরাতন ভিডিও ব্যবহার করে নতুন ঘটনার জন্ম দেয়া হয়েছে কিনা তার সত্যতা নিশ্চিত হতে হবে।এছাড়া ইউটিউব ডেটাভিউয়ার ভিডিওর যে থাম্বনেইল দেখায় সেগুলো দিয়ে মাত্র এক ক্লিকেই সার্চ করে সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বহু ব্যবহারকারী পুরো সংবাদ না পড়ে শুধু শিরোনাম দেখেই শেয়ার করে।সত্যি সংবাদে একটি মিথ্যা শিরোনাম ব্যবহার করে কিংবা প্রসংগ ছাড়াই কোন উদ্ধৃতির অংশ বিশেষ আপলোড করেও সত্য-মিথ্যার ধোঁয়াশা সৃষ্টির সুযোগ থাকে।এ বিষয়টিও গভীর ভাবে পর্যবেক্ষন করতে হবে।
মিথ্যাচারের পরবর্তী পদ্ধতি হলো নকল বিশেষজ্ঞ ব্যবহার করা বা আসল বিশেষজ্ঞের বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করা।একজন বিশেষজ্ঞ আসল কিনা তা যাচাইয়ের জন্য তার ইতিহাস,সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একাউন্ট,ওয়েবসাইট,লেখা,অন্যান্য গনমাধ্যমে তার ব্যাপারে মন্তব্য এবং তার কাজকর্ম নিয়ে সহকর্মীদের অভিমত ইত্যাদি খুঁজে দেখা গুরুত্বপুর্ন।
গনমাধ্যমকে অপব্যবহার করেও গুজব ছড়ানো হয়ে থাকে।বিখ্যাত গনমাধ্যমকে বিশ্বাস করার এবং তাদের সমালোচনা না করার একটি সহজাত প্রবণতা মানুষের রয়েছে।এই প্রবণতাকেই প্রচারনাবিদ ও প্রতারকেরা ব্যবহার করে থাকে।
সামাজিক জরিপ,অর্থনৈতিক সূচকের ডেটা এবং গবেষনায় পদ্ধতিগত বিকৃতি সাধন করেও গুজব রটনার সুযোগ নেয়া হয়।এ বিষয়েও সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, ভাইরাল হতে থাকা মিথ্যা রটনা বা গুজব ব্যক্তি,সমাজ ও রাস্ট্রে কোভিড-১৯ ভাইরাসের চাইতেও কম ক্ষতিকারক নয়।এর থেকে পরিত্রানের জন্য গনসচেতনতার পাশাপাশি ব্যক্তির মেধা-মনন ও প্রজ্ঞার বিকল্প নাই।
