Life Is Beautiful

মন রে আমার

তুই ফেলে এসেছিস কারে
মন, মন রে আমার
তাই জনম গেলো শান্তি পেলি না রে
মন, মন রে আমার।

অতিত ভুলে যাওয়া সহজ না। কিন্তু অতিতে বেঁচে থাকাটাও মরে যাওয়ার সমান। এই ছোট জিবনে আমরা কতো চড়াই উৎরাই পার করি, শুধু একটু ভালো থাকার আশায়, ভালবাসার আশায়। কখনো পাই আবার কখনো পাই না। আবার কখনো পেয়ে হারাই অথবা মাঝ পথে বুঝতে পারি ভুল পথে চলে এসেছি। তখন কি করা? মন ভাঙ্গার শব্দ বাইরে থেকে শুনা যায়না ঠিক কিন্তু ভিতরে তা কোন সুনামির থেকে কম ভয়ংকর নয়। যখন আপনি আপনার কষ্ট কাউকে দেখাতে পারবেন না, বুঝাতে পারবেন না, বলতে পারবেন না, তখন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষদের একজন বলেই মনে হয়। কেউ কেউ এই শোক কাটিয়ে উঠতে পারে আবার কেউ কেউ হারিয়ে যায়।

আমি আমার জিবনে অনেক গুলো সম্পর্কের মধ্য দিয়ে এসেছি। এখানে সম্পর্ক বলতে প্রেমের বা ভালো লাগার সম্পর্কের কথা বলছি। যদিয়ও এর কোন টাই সফলতার মুখ দেখেনি কিন্তু আমি সম্পর্ক গুলকে ব্যর্থতার ঝুলি তেও ফেলব না। প্রতিটা সম্পর্কের একটা নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। সম্পর্কের কোন এক পর্যায়ে গিয়ে আমি আবিস্কার করতে পারতাম যে, আমি যা চাচ্ছি তা আসলে পাচ্ছি না অথবা আমাদের চিন্তা চেতনায় বিস্তর ফারাক। তখন একসময় সম্পর্ক গুলো ধরে রাখা অর্থহীন মনে হতো এবং সম্পর্ক টা হারিয়ে যেত। এখন অনেকেই বলবেন ত্যাগ, আপোষ আর মানিয়ে নেয়াই সম্পর্ক। হ্যাঁ, এইটাও ঠিক, কিন্তু কতক্ষণ ? এই মানিয়ে নেয়াটা উভয় দিক থেকেই আসতে হয়। এমন কি পরিবার থেকেও আসতে হয়। একা একা একটা সম্পর্ক টেকানো যায়না আমার মতে। আমি খুবি ইমোশনাল মেয়ে, বয়সটাও কম ছিল, চঞ্চল ছিলাম যথেষ্ট এবং আমার ভাবতে ভালো লাগে আমার চিন্তা ভাবনাও আমার সমবয়সী দের থেকে কিছুটা ভিন্ন ছিল তখনি। তাই হয়তো ছেলেরা আকৃষ্ট হতো বেশি। আর বলতে বাধা নেই, ছেলেদের এই যে মনোযোগ আমার দিকে, এটাকে আমিও এঞ্জয় করতাম ষোল আনা। তবে কাউকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরানোর মতো ছোট মানুষিকতা আমার ছিলনা এবং আমি তা করি নাই কখনই।

একটা নির্দিষ্ট বয়সের পরে বুঝলাম যে, ভালো লাগা আর ভালবাসা এক নয়। কিশোরী বয়সে বেশির ভাগ মেয়েই ভালো লাগাকে ভালবাসা ভেবে ভুল করে। আর এইটাই স্বাভাবিক, কারন ভালবাসা তো আমরা চোখে দেখিনা আর এইসব নিয়ে কারো সাথে কথাও বলিনা। নিজের কাছে তখন নিজের প্রশ্ন – আমার জিবনে ভালোলাগা আছে অসংখ্য কিন্তু ভালবাসা কই? ভালবাসা কি ছিল কোথায়ও? ভালোলাগা আর ভালবাসায় তফাৎ কি?

আমার জিবনের অসংখ্য ভালো লাগাদের ভীরে ভালবাসা বা প্রেম টাও ছিল। এখনো আছে। আমি বিশ্বাস করি একবার যাকে ভালবাসা যায় আর যাই হোক না কেন, তাকে আর কখনো ঘৃণা করা যায়না, কিছুতেই না। আপনার তার প্রতি অভিযোগ, অভিমান, রাগ, ক্ষোভ থাকতে পারে কিন্তু আপনি তাকে ঘৃণা করতে পারবেন না কখনই। এখন প্রশ্ন আসতেই পারে এতো ভালবাসা তাহলে একা কেন আমি, সংসার নেই কেন আমার? সমস্যা টা এইখানেই আমরা ধরে নেই ভালবাসা মানেই বিয়ে আর সেই বিয়ে টিকে থাকবে মৃত্যু পর্যন্ত। হ্যাঁ, এই টাও ঠিক আছে। এমন টা হলে আমিও খুশি, খুব খুশি। কিন্তু সব সময় এমনটা তো হতে নাই পারে। দুজন মানুষ একজন অন্য জন কে প্রচণ্ড ভালবাসে কিন্তু এক ছাদের নিচে থাকতে গিয়ে হয়তো দেখছে অনেক সমসস্যা। প্রতিদিনের শান্তি নষ্ট। তখন ভালবাসা বজায় রেখে আলাদা হয়ে যাওয়াটা কি খুব খারাপ? ভালো থাকার জন্য মানুষ বিয়ে করে, যদি ভালই না থাকা যায় তাহলে সেই বৈবাহিক সম্পর্কে থেকে লাভ কি? অতএব এখন আমি একা থাকি ঠিক এই কারনেই।

জিবনে প্রথম প্রেম ছিল তখন যখন প্রেম বুঝিনা। শুনতে অবাক লাগছে হয়তো, আবার অনেকেই গালি দিচ্ছেন মনে মনে কিন্তু তবুও এইটাই সত্যি। আমার ধারণা প্রতিটা মেয়ের এমন একটা প্রেম থাকে কিশোরী বয়সে, কিন্তু স্বীকার করতে ভয় বা লজ্জা পায়। এই বয়সের প্রেম টা বেশিরভাগ সময় শুরু হয় ঘর থেকেই। বয়সে খানিকটা বড় খালাতো, চাচাতো, মামাতো অথবা ফুফাতো ভাইদের প্রেমে পরে অনেক মেয়ে। অনেকে আবার পাড়ার কোন বড় ভাই অথবা পাশের বাড়ির ছেলেটার প্রেমে পরে। আবার অনেকেই বাসায় থাকা বা পড়াতে আসা শিক্ষকের প্রেমে পরে। কারন ঐ বয়সে আর আমাদের ঐ সময়ে মেয়েদের চেনা জানার গণ্ডি ঐটুকুই ছিল। বেশির ভাগ সময় এই প্রেম টেকে নাই। আর খুব কম মেয়েই সাহসী হয়ে প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়েছে। তাদের মধ্যে সুখি কতজন আছে আমার জানা নাই। তবে আমার কপাল একটু ভালো ছিল আমি যাকে পছন্দ করতাম তাকে আমার পরিবারের সবাই পছন্দ করত কিন্তু তাবুও সম্পর্ক টা টেকে নাই। কারন, ঐ বয়সে সম্পর্ক যত্ন করার মতো জ্ঞান আমার ছিলনা আর আমার পছন্দের মানুষের মাথায় ছিল নিজের চিন্তা। সত্যি কথা বলতে আমি তখন বুঝতেই পারতাম না যে ভালবাসার দায়বদ্ধতা কি। আমি শুধু ভাবতাম ওনার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে, মজা করতে ভালো লাগে, দেখা না হলে ভালো লাগেনা এইটুকুই। ভালবাসা বুঝিনাই। অতএব একটা দীর্ঘ সময় পরে ভালবাসা টা হারিয়ে গেলো। তার পরে দীর্ঘ সময় একা থেকেছি। একা থেকেছি বললে ভুল হবে, অনেক ভালো লাগার মধ্য দিয়ে গেছি। আমাকে পছন্দ করত এমন অনেকে ছিল, তাদের দেখে ভালই লাগতো। কিন্তু আমি জানতাম আমি তাদের চাইনা। তারপরে ঠিক ২৩ বছর বয়সে আবার প্রেমে পড়েছিলাম সহপাঠীর কিন্তু আমি সাহসী ছিলাম না। অতঃপর আমার প্রেমিকের সাহসেই আমাদের সম্পর্ক টা বিয়ে তে গড়ায়। কিন্তু এখন ভাবি ঐ বয়সে বিয়ে না হলেই ভালো হতো। বিয়ের মতো একটা সম্পর্কের দায়িত্ব নেয়ার মতো, পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের ম্যানেজ করার মতো যথেষ্ট মানুষিক শক্তি আমার বা আমাদের ছিলোনা। অতএব আর মৃত্যু পর্যন্ত এক সাথে থাকা হলনা। অনেকেই এখন বলবেন ঐ বয়সে অনেক মেয়ে মা হয়ে যায়। আমিও স্বীকার করি। কিন্তু তার মানি এই নয় যে সবাইকে সব পারতে হবে, আমিও পারিনি আর আমার মতো আরও অনেক আছে যারা পারেনা। আমাদের সমাজের চোখে হয়তো আমি বা আমার মতো মেয়েরা খারাপ কিন্তু সমাজ কিন্তু দায়ভার নেয়না শুধু খারাপ বলেই খালাস।

আগেই বলেছি আমি খুবি ইমোশনাল মেয়ে। তাই আমার ভালো লাগার কোন কমতি নাই। ভালবাসাও ভিতরে অনেক। ভালবাসতে আমি ভালবাসি। আমি জানি আমি আবারো প্রেমে পরব। হয়তো ভুল মানুষের অথবা ঠিক মানুষের। ভালবাসা কোন অন্যায় না। কিন্তু ভালো লাগা গুলোর নাম ভালবাসা দেয়া অন্যায়।শুধু মাত্র শারীরিক চাহিদা মেটানোর জন্য ভালবাসা শব্দটা ব্যাবহার করা অন্যায়। ভালবাসি বলে প্রতারণা করাটা অন্যায়।
অতিত ভোলা যায় না, আর আমি ভুলতেও চাইনা। অতিতের ভালবাসা, সুন্দর মুহূর্ত, ভালোলাগা সব আমার ভিতরেই আছে, আমি তাদের যত্ন করি কিন্তু তাদের আকরে ধরে রাখিনা। কখনো মন খারাপ হয়না এমন টা নয়, তবে সেটা সাময়িক। তাই আমার মনে শান্তি নাই এইটা আমি বলবনা। আমি ভালবাসতে ভুলে যাইনি। ভালথাকতেও ভুলবোনা।

লিখেছেন
নাজিয়া জ্যামি

খুব বেশীদিন হয়নি আমি লেখালেখি শুরু করেছি। মনে মনে অনেক কিছু লিখে ফেলি, কিন্তু কাগজে কলমে সহজে হয়ে উঠেনি। আমি এক সন্তানের মা এবং কিছুদিন হল বাংলাদেশের বাইরে বসবাস করছি।

সব পোস্ট দেখুন
মন্তব্য করুন

লিখেছেন নাজিয়া জ্যামি