প্লাবন

প্লাবন

সকালে যে কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠেছিলো কমলা ভেবে পায়না। পুরো সময়টাই আজ বৃথা যাবার অবস্হা। শাড়িটা পুরোনো হলেও মুখে ভারী প্রসাধন।প্রসাধন মানে মুখ ভর্তি পাউডার চোখে কাজল ঠোঁটো টকটকে লাল লিপিষ্টিক।

পাঁচতারা একটি হোটেলের অপজিটে রাস্তার এক কোনে গাছের আড়াল হয়ে দাড়িয়ে আছে। তার চোখ দুটো কাউকে খুঁজছে, তাকে যার প্রয়োজন।তেমন কাউকে পাচ্ছে না কুফা লেগে গেছে আজ।হোটেলের দিকে পলকহীন চেয়ে আছে,কতো রকম মানুষ আসছে যাচ্ছে। কেউ একা কেউবা জোড়া শালিকের মতো কারো সাথে ছোট ছোট বাচ্চা। নিজের বাচ্চার কথা মনে পড়ে বুকের ভীতর মোচড় দিয়ে ওঠে।

হায়রে টাকা হায়রে জীবন,বৈষম্যের এই দুনিয়া কেউ কারো খবর রাখেনা। কেউ টাকার পাহাড় গড়ে কেউ অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর সাথে আঁতাত করে।

নাম তার কমলা,চেহারা ও গায়ের রং এর সাথে কমলার কোন মিল নেই।নামটা যে কে রেখেছিলো জানেনা দেখতে কালো জামের মতো, নামের সাথে চেহরার আসমান জমিন ব্যাবধান।চার পাঁচ ভাই বোনের সংসারে সে সবার বড়।মা অন্যর বাড়িতে ঝি এর কাজ করতো বাবা খাটতো কামলা।বাবা মায়ের আয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কোনমতে চলে যেতো।চৌদ্দ পনের বছর বয়সে গ্রামের ছেলে জমিরুদ্দীর সাথে তার বিয়ে হয়,জমিরুদ্দী ঢাকায় রিকসা চালায়,কালো হলেও চেহারাটা কমলার মন্দ নয়। কোন প্রকার যৌতুক ছাড়া বিয়ে করে জমিরউদ্দী কমলাকে ঢাকায় করাইল বস্তিতে ছোট খুপরির মতো ঘর ভাড়া করে ওঠায়, যার দুপাশে গুলশান বনানীর মতো অভিজাত এলাকা।রাজা মন্ত্রী আর সব বড় লোকের বাস।চার পাশে আলিশান বাড়িগুলোকে চোখ ভরে দেখে, আর নিজেকেও তার রাজা রাজা মনে হয়,এমন সুন্দর বাড়ি ঘর দেখাতো দূরে থাক কল্পনাতেও আসেনি কখনও।তার ভাবটা এমন যেন বাড়িগুলোকে সে গিলে খায়।

নতুন বউ আসছে শুনে অন্য ঘরের মানুষ গুলো তাকে দেখতে হুমরি খেয়ে পড়ে। চেহারা আর গায়ের রং এর সাথে নাম শুনে অনেকেই আড়ালে আবডালে হেসে খুন।নতুন বউ মানেই অপূর্ব সুন্দরী হতে হবে,তা ধনী বা গরীব যাই হোক।কমলার তাতে কিছু আসে যায়না গায়ের রংতো আর সে বানায় নি আল্লাহ বানিয়েছে তাতেই শোকর।নিজের হাতে ক্ষমতা থাকলে সুন্দর হয়ে সবাইকে দেখিয়ে দিতো।

দিন ভালোই কাটছিলো বছর খানিক পর কোল জুড়ে আসে এক মেয়ে,দেখতে মায়ের মতোই, তাতে অবশ্য জমিরউদ্দী মন খারাপ করেনা হাজার হলেও তারই সন্তান।হেসে খেলে চলছিলো দিন।কিন্তু এ সুখ তাদের কপালে বেশীদিন সয়না এক্সিডেন্ট করে জমিরুদ্দী একটা পা হারায়।অন্ধকার নেমে আসে তাদের জীবনে।একদিকে পঙ্গু স্বামী অন্যদিকে কোলে ছোট বাচ্চা কি করবে ভেবে পায়না কমলা।অবশেষে পাশের এক ভাবী তাকে বাসায় কাজ খুঁজে দেয়, তিন চারটা বাসায় কাজ করে স্বামী সন্তান নিয়ে তার ভালোই দিন চলছিলো।একদিন এক বাড়িতে কাজ করতে যায়। বাড়ির খালাম্মা তখন বাইরে ছিলো। বাড়ির কর্তা তাকে টাকার প্রোলোভন দেখিয়ে বিনিময়ে তাকে কু প্রস্তাব দেয়।কমলা সায় দেয়না, অবশেষে ভদ্রলোক তাকে জোর করে জড়িয়ে ধরে। ঠিক সেই সময় গৃহকর্ত্রী ঘরে ঢুকে দেখে ফেলে।তারপর যা হবার তাই হলো খালাম্মা তাকে চুলের মুঠি ধরে ঘর থেকে বের করে দেয়।কমলার কোন কথাই শুনতে চায়না।কমলা ধিক্কার জানিয়ে বের হয়ে আসার আগে বলে আসে, যে দোস করলো তারে নিয়া তার সোহাগ নিয়া আপনে ঠিকই থাকবেন আমার বেলায় করলেন অবিচার,ভদ্দরলোকের মুখোস পইরা থাকেন আপনেরা, আপনেরা দোস করেন বিচার অয় আমাগো ছিঃ।

অবশেষে কমলা বেছে নেয় এই পথ যার নাম পতিতাবৃত্তি পৃথিবীর কোন জায়গা আর সে নিরাপদ মনে করে না।মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে কোন শকুনের খাবার সে হবে না সে নিজেই শকুন পুষবে । এই ক্ষোভ দুঃখে তার এই পতিতাবৃত্তি।শুরু হয় নতুন এক জীবন।এই জীবনে সে যেন রাণী, রাতের রাণী।কাউকে সে ভয় পায়না জবাবদিহিতাও নাই

কিন্তু আজ কি হলো কাউকে খুঁজে পাচ্ছে না। কাউকে না পেলে তার চলবে কিভাবে?পেটের মধ্যে রাক্ষসী খিদে নেড়েচেড়ে উঠছে।বমি বমি ভাব লাগছে।ঘরে তার অপেক্ষায় পঙ্গু স্বামী ছোট্ট দুধের বাচ্চা। বাচ্চটা না খেতে পেরে ক্ষিদের যন্ত্রনায় নিশ্চয়ই কাঁদছে। বুকের দুধ খাওয়া বাচ্চা।দুধ না খাওয়াতে পেরে তারও বুকে যেন কষ্ট অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এদিকে তার স্তন ফুলে টপ টপ করে দুধ পড়ছে আর ব্যাথাও করছে বাচ্চা না খাওয়া পর্যন্ত এ ব্যাথা যাবেনা।

: এই তোর রেট কতো? হঠাৎ কারো কথায় সম্বিৎ ফিরে আসে।
: যা দ্যান, আইজ কুনো দামাদামি নাই শইলডা ভালা না,বাসায় যাওন লাগবো, যা দিবেন তাই নিমু।

আর এক মুহুর্তে দেরী না করে কমলা বাসায় চলে আসে।অন্যদিন তার ভালোই কামাই হয় আজ একজনই যথেষ্ট।বাসায় যাওয়ার তাড়া।

বাড়িতে ঢুকে গায়ে কোন মতে পানি ঢেলে নিজেকে শুদ্ধ করে আগামী প্রস্তুতির জন্য।জমিরুদ্দীকে খাবার দিয়ে।বিছানায় গা এলিয়ে মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে দুধ খাওয়ায়।অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকা শিশুটি মায়ের একটি স্তন মুখে পুরে ঢক ঢক করে খায় আরেকটি স্তন ছোট্ট হাতে নাড়াচাড়া করে আর মায়ের চোখের দিকে তাঁকিয়ে মিটি মিটি হাসে।কমলারও এতক্ষনের ব্যাথাটা কমে যায়।

মেয়ের মুখের দিকে তাঁকিয়ে কমলার দুচোখ জলে ভরে যায়।বড় হলে সেও কি তার মতো এমন হবে? এই জীবন সেতো চায়নি, বউ হয়ে স্বামী সন্তান নিয়ে শান্তিতে থাকতে চেয়েছিলো,সভ্য সমাজের কিছু মুখোসধারীর জন্য আজ সে পতিতা।স্বামী পঙ্গু না হলে কোনদিনও ঘর ছেড়ে পরের বাড়ি কাজ করতে যেতোনা।যাকে খালাম্মা ডেকে শ্রদ্ধা করতো তিনিও তাকে বিশ্বাস করলেন না,দোসীর বিচার না করে পুরো অপরাধ তার উপর চাপিয়ে দিলো।যুগে যুগে টাকার কাছে বিত্ত বৈভবের কাছে খেটে খাওয়া মানুষগুলো এভাবেই জীবন যুদ্ধে হেরে যায়।অপরাধীর বিচার হয়না।আসামীর কাঠগড়ায় দাড়াতে হয় তাদের মতো বিত্তহীন অসহায় মানুষদের। আর নিজেকে সামলাতে পারেনা।চাপা কান্না প্লাবন হয়ে ভাসিয়ে দেয় চোখের উঠোন।

লিখেছেন
শারমিন সুলতানা রীনা
সব পোস্ট দেখুন
মন্তব্য করুন

লিখেছেন শারমিন সুলতানা রীনা