Candle

নিয়ম ভাঙ্গার নিয়ম

মাথার ভিতর পুরোটা দিন কতো কিছু চলে, মনে হয় এইটা বলা দরকার, ঐটা বলা দরকার। কিন্তু লিখতে গেলেই প্যাঁচ লেগে যায় সব। বুঝে পাইনা এর কারন কি।

আমরা ছোট থেকে বড় হই “না” শব্দ টা সঙ্গী করে। আমাদের জীবনে আমরা এতো বেশি না শুনি যে জীবনের আগা গোড়া নেতিবাচক চিন্তায় ভরপুর থাকে। ছেলে মেয়ে সবার বেলাতেই এমন হয় তবে তুলনামুলক মেয়েদের একটু বেশি না এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ছেলেরা তবুও একটা বয়স পরে কিছুটা রেহাই পায় কিন্তু কোন কোন মেয়ের মৃত্যু অবধি না এর সাথেই সংসার করতে হয়।

আমার ছোটবেলাটা আর সবার মতই ছিল। বয়সের পার্থক্য কম ছিল বলে ভাই বোনেরাই একে অপরের খেলার সঙ্গী ছিলাম। আমার মা খুবি কড়া মহিলা ছিলেন। নিয়ম কানুনের শেষ ছিলনা। বাবা ব্যাস্ত থাকতেন নিজের কাজে। মায়ের হাতেই সব দায়িত্ব। মেয়ের মা বলে হয়ত মায়ের দায়িত্ব আরও বেশি ছিল। নিয়ম কানুনের ঝুলিটাও বেশ বড় ছিল। সকালে ঘুম থেকে ওঠা, স্কুল যাওয়া, প্রাইভেট পড়া সবখানেই নিয়ম ছিল। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে দেরি হলে মায়ের শাস্তির হাত থেকে রেহাই ছিলনা। দুপুরের গোসল, খাওয়া এবং ঘুম একদম ঘরির কাটা ধরে করতেই হবে। একটু এদিক সেইদিক হলেই ভাত তরকারি রান্নার কাঠি টা দিয়ে সপাং সপাং করে পিঠে হাতে উত্তম মাধ্যম শুরু। একা কোথাও যাওয়া বারন ছিল। কারো সাথে কথা বলাও বারন ছিল। পারা প্রতিবেশীর বাসায় যাওয়া বারন ছিল। আরও কতো কি।গল্পের বই পরতে দেখলেও মাইর ছিল কপালে। সারাদিন ভালো রেজাল্ট এর জন্য নসিহত শুনতে হতো। গায়ের রঙ কালো ছিল আমার, এইটাও মায়ের চিন্তা ছিল। দেখতে বড় ছিলাম এবং গায়ের রঙ চাঁপা ছিল বলে আমার বাবা ছাড়া মোটামুটি সবাই বিয়ে দিয়ে দেয়ার পক্ষে ছিল স্কুল শেষ হবার আগেই। যদিও বিয়েটা আমার মোটেই তখন হয়নাই আর আমার মায়ের এতো কষ্টের পরেও আমি লেখা পড়াতেও মনোযোগী ছিলাম না। তার চেয়ে বড় কথা আমি নিরবে মোটামুটি সব ধরনের দুষ্টামি বাঁদরামি করেছি মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে।

আমার যা মন চাইতো, মা বাবার তা ভালো লাগতো না। আবার বলতেও পারতাম না কখনো কি চাই বা কি ইচ্ছা করছে। ভয় টাও ছিল প্রচণ্ড তাই ভয় থেকেও কিছুই আর বলা হতোনা। আর নিজের মন কেও মানানো যেতনা সুতরাং শুরু হল লুকচুরি খেলা। সেই যে লুকোচুরি খেলা শুরু হল তারপরে চলছে তো চলছেই। মাঝখানে বিয়ে হল, সংসার হল, সন্তান হল। আগে শুধু বাবা মায়ের নিয়ম ছিল, তার সাথে আরও যোগ হল শ্বশুর বাড়ির নিয়ম।

আমার ছেলে ক্লাস সেভেন এ পড়ে। আমি তাকে দেখি এবং এইখানে আরও অনেক স্কুলে যাওয়া ছেলে মেয়ে দের দেখি, ওরা কতো সাবলীল, ভয় নেই, কথায় কথায় মিথ্যা বলেনা। এরা একা একা স্কুলে যায়, গ্রুপ করে পড়াশুনা করে, একে অপরের বাসায় রাত কাটায়, আড্ডা দেয়, এই দেশে এইটাই সাভাবিক। খুব ছোট বয়স থেকেই এদের অনেকের প্রেম বোধটাও জাগ্রত হয়। এখানে এই সবটাই স্বাভাবিক। পড়াশুনার জন্য কাউকেই চাপাচাপি করা হয়না তবুও এরা সুন্দর লেখা পড়া টা শেষ করছে। বাবা মায়ের সাথে সন্তানের দূরত্ব এখানে অনেক টাই কম। অথবা বলতে পারেন নিয়মের বিশাল দেয়াল টা এখানে একটু ছোট অথবা নাই, তাই এরা মনের দিক থেকেও একে অপরের খুব কাছাকাছি থাকে। এখন অনেকেই বলবেন আমাদের সমাজ ব্যাবস্থা ভিন্ন, সিকিউরিটি নাই, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল সন্তানের বন্ধু হবার জন্য সমাজ ব্যাবস্থার দোহাই দেয়াটা কি খুবি বেমানান নয়? সংসারের এই কঠিন দেয়াল টা যদি কোন ভাবে ভাঙ্গা যায়, তাহলে ধীরে ধীরে সব প্রতিকূল অবস্থাই অনুকূলে আসবে। সংসার দিয়েই সমাজ আর সমাজ দিয়েই দেশ। পরিবর্তন টা সংসার থেকে, আপনার আমার থেকেই শুরু হোক। আমাদের সন্তান গুলো মন খুলে বাচুক, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হবার আগে মানুষ হোক।

এই যে আমি পরিবারে এতো এতো নিয়মের একটাও ঠিক মতো পালন না করে, এক অস্থিরতা নিয়ে বড় হয়েছি তাতে কি লাভ হয়েছে? হ্যাঁ, অনেকেই হয়ত পেরেছে কিন্তু সবাই পারেনা, যেমন আমিও পারিনি ।

এখন, যখন আমি সন্তানের মা, তখন এসে ভাবি কেন এমন ছিলাম বা কেন এমন টা করতাম তখন। ভাবি কেন মায়ের এতো অবাধ্য ছিলাম, কেন পড়াশুনা ঠিক মতো হলনা, কেন শ্বশুরবাড়ির মন পাওয়া গেলো না, কেন জীবন এখনো অগোছালো, কেন নিয়মের ভিতরে চলতে পারিনি? কেন এতো লুকচুরি করতে হল? কত কত মিথ্যা বলেছি শুধু বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিবো বলে। প্রেমিকের সাথে তারালাপ করার জন্য কত চালাকি করেছি। পড়াশুনা করি নাই ঠিক মত। ভাবি – কেন? এখন আমি একা থাকি । আমার কারো কাছে কোন প্রকার জবাবদিহিতা নাই। কিন্তু এখন তো আমার এমন সবকিছু ভেঙ্গে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছা করেনা। বন্ধুদের সাথে সময়ের বাইরে আড্ডা দেয়া হয়না। এখন আবার অনেকেই বলবেন বয়সের তো একটা ব্যাপার আছে। হ্যাঁ, আমিও স্বীকার করি বয়স একটা ফ্যাক্ট। আর সেই জন্যই কম বয়সে সন্তান যেন অস্থিরতায় না ভোগে, শাসনের বেড়াজালে তার শৈশব যেন যান্ত্রিক না হয়ে যায় এবং সর্বোপরি অভিবাবক হিসাবে আপনাকে যেন সে কাছের ভাবে, আপন ভাবে, বিশ্বাস করে সেই জায়গাটাও নিশ্চিত করা মা বাবা হিসাবে আপনার জন্য জরুরি। কেননা, এই ছোট বয়সে বয়োজ্যেষ্ঠ দের ভয়ে চুপসে যাওয়া ছেলে বা মেয়েটাই সেল্ফ কনফিডেন্স টা হারিয়ে ফেলে এক অস্থিরতা নিয়ে বড় হয়। যা পরবর্তী জীবনে তার সাফল্যের অন্তরায়।

আমাদের অলিখিত নিয়ম গুলো যদি একটু শিথিল হতো হয়তো ঐ সময় আমি এবং আমার মতো আরও অনেকের জীবন টা আজকে অন্য রকম হতো। নিয়ম জুড়ে দিলেই নিয়ম ভাঙ্গার প্রবণতা বারে। আমার কাছে অন্তত তাই মনে হয়। সন্তানকে নিয়ম আর শাসনের বেড়াজালে বড় করা হয়তো অনেকের কাছেই ঠিক মনে হয় কিন্তু আমার কাছে নয়। নিয়মের বদলে ভালো অভ্যাস দিতে হবে। শাসনের বদলে ভালো মন্দ বুঝাতে হবে। অভিবাবক বলে শুধু নিজের ওজন নিয়ে না চলে বন্ধু হওয়াটা খুব খুব জারুরি।

জ্ঞান হবার পর থেকেই আমরা যে হারে না শব্দটি ব্যাবহার করি, তাতে করে আমাদের জীবন অটো নেতিবাচক চিন্তায় ভরে যায়। তারপরে ইতিবাচক কিছু পাওয়া আর সহজে সম্ভব হয়না।

শুধু মাত্র ভালবাসা আদর দিয়ে যা আদায় করা সম্ভব, শাসন আর নিয়ম দিয়ে তার সিকি ভাগ সম্ভব না।

লিখেছেন
নাজিয়া জ্যামি

খুব বেশীদিন হয়নি আমি লেখালেখি শুরু করেছি। মনে মনে অনেক কিছু লিখে ফেলি, কিন্তু কাগজে কলমে সহজে হয়ে উঠেনি। আমি এক সন্তানের মা এবং কিছুদিন হল বাংলাদেশের বাইরে বসবাস করছি।

সব পোস্ট দেখুন
মন্তব্য করুন

লিখেছেন নাজিয়া জ্যামি