নারীবাদ
নারীবাদ

নারীবাদ, K শেইপড অর্থনীতি, CRISPR Cas9, নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার, মধ্যবিত্তের ভূমিকা

বেশ কিছুদিন আগে ফেইসবুকে বেগম রোকেয়াকে নিয়ে কয়েকটা পোস্ট দেখছিলাম। সম্ভবতঃ তার দুই একদিন আগে বেগম রোকেয়ার জন্মদিন বা মৃত্যুদিন ছিল এবং উনাকে নিয়ে কোনো একটা পত্রিকায় কোনো একটা রিপোর্ট করা হয়েছিলো। ঐ রিপোর্টে বাঙালি মুসলমান উনাদের স্বভাবসুলভ জোশে ঝাঁপায়ে পড়ে উনাকে বে**শ্যা ফেশ্যা বিভিন্ন গালিগালাজ করেছেন, বলেছেন উনিই বাঙালি নারীদের পর্দা থেকে বের করে নিয়ে এসে তাদেরকে শিক্ষিত করার মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে ধ্বংস করেছেন। আর সেইসব গালিগালাজ দেখে আমার ‘প্রগতিশীল’ বন্ধুরা দেশ ও দশের ভবিষ্যতের কথা ভেবে খুব মন খারাপ করেছেন।

আমার মন খারাপ হয় নাই।

আমি মনে করি, গালিগালাজ যত বেশি হবে, ততই প্রমাণ হবে, নারীবাদের কুইনাইনতুল্য অসুধে কাজ দিচ্ছে।

হাহা।

প্রথমতঃ যদি ইসলাম দিয়েই শুরু করি, তাহলে বলতে হবে, কুরানে কোথাও বলা নাই, নারীরা পড়ালেখা বা চাকরি বাকরি করতে পারবেন না। নবী মুহম্মদের কন্যা ফাতেমা নিজে শিক্ষিত ছিলেন, তিনি কুরান সংকলন করেছেন, উটের পিঠে উঠে যুদ্ধও পরিচালনা করেছেন। তবে ইসলাম বা অন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের নিরিখে নারীশিক্ষা আমার আলোচ্য বিষয় না। নারীবাদের কিছু বিষয় ধর্ম এ্যাপ্রুভ করে, কিছু বিষয় ধর্মের ‘গ্রে এরিয়া’র এ্যামবিগিউটিতে পড়ে, কিছু বিষয়ে ধর্মের সরাসরি বিরোধিতা আছে। আমার আলোচনার বিষয় নারীবাদের তৃতীয় ওয়েভ বা শরীরের অধিকার, যা সকল প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

আমি এর আগে আমার প্রচুর লেখায় উল্লেখ করেছি, পশ্চিমের মত ভারতীয় উপমহাদেশের নারীবাদকে ওয়েভ দিয়ে ভাগ করা সম্ভব না। এই অঞ্চলে এখনও একই সাথে নারীর রাজনৈতিক অধিকার, কিছু অঞ্চলে নারীর অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন চলছে; এবং একই সাথে কিছু অঞ্চলে শরীরের অধিকার নিয়ে কথা বলা শুরু হয়েছে। এবং এই আন্দোলন কোনো সরলরৈখিক আন্দোলন না, এই আন্দোলনে ওভারল্যাপ আছে, গোয়িং ব্যাক এ্যান্ড ফোর্থ আছে।

আমার মনে আছে, বেশ কয়েক বছর আগে আমি ফেইসবুকে বান্দারবনের নদীতে গামছা পরে আমার সাঁতার কাটার অর্ধনগ্ন ছবি দেয়ার পর আমার এক বামপন্থী নারীবাদী বন্ধু বলেছিলেন, আমার এইসব ছবির কারণে বাংলাদেশের প্রান্তিক নারীরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। আমার এইসব ছবি বাংলাদেশের উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদীদের আরও উগ্র করে তুলবে এবং উনাদের মাধ্যমে প্রান্তিক নারীদের ইস্কুলে যাওয়ার মত বিষয় বাধাগ্রস্থ হবে। আমি আমার বাংলাদেশী বামপন্থী বন্ধুদের চিন্তার অপরিপক্কতা দেখে মাঝেমধ্যেই খুব হতাশ হই। আমি উনাকে বলেছিলাম, প্রথমতঃ আমিই বাংলাদেশের একমাত্র নারী না যে নগ্ন বা অর্ধনগ্ন ছবি আপলোড করি। আমার চাইতে বাংলা ফিল্মের নায়িকারাই বেশি শরীর প্রদর্শণ করেন। দ্বিতীয়তঃ ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের যুগে, ডিজিটাল টেকনোলজির যুগে তথ্যের আদানপ্রদান শুধু ঢাকা-কুমিল্লায় লিমিটেড না, এই যুগে আপনি কাঁথা গায়ে বিছানায় শুয়ে বোম্বে চানাচুর আর দুধ চিনিবহুল চা খেতে খেতে রাত তিনটায় আন্দামানের মফিজ আর হনলুলুর সখিনা আর আমেরিকার বিলকিসের পাছার উপরের ট্যাটু আর বাথরুমের টাইলের রঙ আর উনাদের ফ্রিজের ভেতরের তিনদিনে বাসি চাইনিজ টেকএ্যওয়ের গল্প জানতে পারবেন। সুতরাং একমাত্র আমার মাধ্যমেই উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদীরা তথ্য পান ভাবলে খুব হাস্যকর ভাবনা হবে। তৃতীয়তঃ কারুর ধর্মহীন স্বাধীন জীবনের ছবির মাধ্যমে যদি নিম্নবিত্ত বা দরিদ্র বা প্রান্তিক নারীর স্বাধীনতা খর্ব হয়, তাহলে তো পৃথিবীর তাবত শিক্ষিত স্বাধীন আধুনিক নারীদের তাদের ডিগ্রি সার্টিফিকেট ছিঁড়ে বুড়িগঙ্গার কালো পানিতে ভাসিয়ে দিয়ে বস্তা গায়ে মাটির তের হাত নিচে ঢুকে বসে থাকতে হবে, যেন তাদের চাঁদে যাওয়ার গল্পে, তাদের সাইকেল বা স্পেস শাটল চালানোর গল্পে, তাদের নিজের শরীরকে নিজ খুশিমত ব্যবহারের গল্পে ঐ দরিদ্র নারীর স্বাধীনতা বিঘ্নিত না হয়! হাহা।

আমি ফেইসবুকে আমার নগ্ন, অর্ধনগ্ন ছবি দেই, আমার বহুগামী যৌন জীবনের ছবি দেই, রক্তাক্ত প্যাড বা ট্যাম্পনের ছবি দেই এবং এই নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলি। এর মাধ্যমে কি আমি আপনাকে নগ্ন হয়ে যাওয়ার, বহুগামী জীবন যাপনের পরামর্শ দেই?

না।

এর মাধ্যমে আমি সমাজকে জানাই যে পিরিয়ডের মত ব্রায়ের মত ওড়নার মত ট্যাবু দিয়ে নারীদের লজ্জা দিয়ে তাদের পদানত করে রাখা সম্ভব না, এর মাধ্যমে আমি নারীদের কনফার্ম করি যে নিজ ইচ্ছামত জীবনকে স্বাধীনভাবে যাপন করার আপনার যোগ্যতা এবং অধিকার আছে। এর মাধ্যমে আমি আপনাকে রিএ্যাশিউর করি যে আপনার শরীর সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ে আপনার সিদ্ধান্তই শেষ কথা। এই শরীর আপনি এক লক্ষ উনত্রিশ হাজার গজের কাপড়ে ঢেকে রাখবেন না সব কাপড় ফেলে নগ্ন হয়ে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন, এই শরীর কাকে ‘ব্যবহার’ করতে দিবেন, কাকে ‘স্পর্শ’ করতে দিবেন, কাকে ‘দেখতে’ দিবেন, এই শরীরের মাধ্যমে আপনি কখন সন্তান জন্ম দিবেন বা দিবেন না, কতজন সন্তান এই শরীরে ধারণ করবেন- তার সম্পূর্ণ সিদ্ধান্ত আপনার।

অন্য কারুর না।

এইক্ষেত্রে সমাজ এবং ধর্মের প্রসংগ আসবে। এইক্ষেত্রে আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, এই স্বাধীনতাকে কি স্বেচ্ছাচার বলা যাবে না? আপনি জিজ্ঞেস করতে পারেন, এই স্বেচ্ছাচারিতা কি সমাজের জন্য উপকারী?

আসুন, সেই ক্ষেত্রে একটু ইতিহাস কচকচানো যাক। আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে, উদ্বৃত্ত সম্পদ নির্ভর অর্থনীতির উদ্ভবের সাথে সাথেই পৃথিবীর প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক পুরুষতান্ত্রিক বা পিতৃতান্ত্রিক ধর্মের আবির্ভাব হয়েছে। উদ্বৃত্ত সম্পদ নির্ভর অর্থনীতি পুঁজিবাদের প্রিকারসার, পুঁজিবাদী অর্থনীতির ‘পিতা’। এই অর্থনীতির প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে স্বল্পতম সময়ে সর্বোচ্চ সম্পদের সিন্থেসিস। এবং ফলতঃ স্বল্পতম ব্যয়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক শ্রমিক উৎপাদন পুঁজিবাদ-পুরুষতন্ত্র-পিতৃতন্ত্রের প্রধান উদ্দেশ্য। এবং এই কারণেই পৃথিবীর সকল প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নারী পুরুষের দায়িত্ব ভাগ করে দেয়, এই কারণেই ধর্মগ্রন্থে বলা হয়, নারীর প্রধান কাজ সন্তান উৎপাদন। এবং এই সন্তান এবং তার মাধ্যমে সম্পত্তি যেন বেহাত না হয়, তাই সন্তানের ‘পিতৃ’পরিচয় জরুরী, তাই পরকীয়া বা ব্যাভিচারকে নিরুৎসাহিত করা হয়, তাই বিয়েকে ‘পবিত্র’ বন্ধন বলে ঘোষনা করা হয়। এই কারণে বিধবাদের একঘরে করা হয়, এই কারণে বিবাহবিচ্ছেদকে সামাজিকভাবে ঘৃণ্য করে তোলা হয়, এই কারণে সতীদাহ হয়।

সমস্যা হচ্ছে, খুব সঙ্গত ‘শারীরিক’ কারণেই এই ব্যবস্থা কোনো সাম্যবাদী ব্যবস্থা না। যেহেতু নারীর সন্তান জন্মদান ‘বয়স’ নির্ভর- তাই নারীর গর্ভকে যত বেশি ব্যবহারের মাধ্যমে যত বেশি সন্তান এবং তার মাধ্যমে যত বেশি সম্পদ তৈরি করা সম্ভব, তত বেশি পদ্ধতিতেই নারী শরীরকে ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তি পুরুষের হাতে কেন্দ্রিয় পুরুষ মস্তিষ্ক তৈরির মাধ্যমে অধিকতর ক্ষমতা দেয়া হয়েছে গত কয়েক হাজার বছর। বহুগামিতা নারী পুরুষসহ সকল লিঙ্গের মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলেও শুধুমাত্র পুরুষকে বহুগামী হবার রাস্তা দেখানো হয়েছে, এবং নারীকে শুধুমাত্র একজন পুরুষের সাথে চিরজীবনের জন্য যুক্ত করে দেয়া হয়েছে। এমনকি বেহেশতের বর্ণনায় একজন পুরুষ পুরষ্কার হিসাবে ৭২ জন সঙ্গী পেলেও একজন নারী নাকি শুধুমাত্র তার ইহলৌকিক ‘সৎ’ স্বামীকেই পুরষ্কার হিসাবে পাবেন। অর্থাৎ ইহকালে যেই গর্দভের সাথে নারীকে জীবন কাটাতে হচ্ছে, পরকালে গিয়েও ঐ গর্দভের হাত থেকে নারীর মুক্তি নাই, হাহা!

সব স্বামীই নিশ্চয়ই গর্দভ নন, কিন্তু ছেলেদের জন্য বহুগামিতার ব্যবস্থা থাকার পরেও এমনকি বেহেশতের বর্ণনায় যখন নারীদের জন্য তাদের একমাত্র স্বামীর ব্যবস্থা থাকে, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না, ধর্মগ্রন্থ ঈশ্বরের রচনা না। ধর্মগ্রন্থ পুঁজিবাদ- পুরুষতন্ত্রের রচনা।

আমি বিয়ে প্রথার বিরোধী। কিন্তু তার অর্থ এই না যে আমি সকলকেই বিয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমি বিয়ের বিরোধী কারণ আমি জানি বিয়ের প্রাচীন প্রথাই পুরুষতন্ত্রের মাধ্যমে পুঁজিবাদ টিকায়ে রাখার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। এইক্ষেত্রে ডিসক্লেইমার দিয়ে রাখতে চাই। দুইজন আধুনিক শিক্ষিত অধিকার সচেতন মানুষ যদি নিজেদের ভালোবেসে বিয়ে করে বা না করে একসাথে থাকেন, সন্তান উৎপাদন করেন, একে অপরকে সারাজীবন একইভাবে ভালোবাসার প্রতিজ্ঞা করেন, তাতে আমার আপত্তি থাকার কিছু নাই। কিন্তু মজার (অর্থাৎ দুঃখজনক) বিষয় হচ্ছে, বেশিরভাগক্ষেত্রে ভালোবাসা এক জায়গায় থাকে না। গার্হস্থ্য অর্থনীতির চাপে পড়েই হোক, একইসাথে একগাদা দায়িত্ব পালনের কারণেই হোক, নিউরোট্রান্সমিশানের বা হরমোনাল ঘাটতি থেকেই হোক, ভালোবাসা সাইন-ওয়েভের মত ওঠানামা করতে করতে একটা সময় পরে বেশিরভাগক্ষেত্রে নাই হয়ে যায়। তখনই বিয়েতে পরকীয়া ঢোকে, তখনই বিয়েতে বহুগামিতা ঢোকে, তখনই বিয়েতে তথাকথিত অশান্তি ঢোকে। আর শুধুমাত্র দুইজন মানুষের মনের অমিল থেকেই যে বিয়েতে ঝামেলা হয়, তা তো না। আমাদের বাঙালী সমাজে নারী এবং পুরুষকে ছোটবেলা থেকেই বিকলাঙ্গ পরমুখাপেক্ষী হিসাবে বড় করা হয়। বেশিরভাগ পুরুষেরা রান্না করতে শেখেন না, কাপড় কাঁচতে শেখেন না, নিজের কাজ নিজে করতে শেখেন না, বাচ্চা পালতে শেখেন না। অপরদিকে বেশিরভাগ নারীরা গাড়ি চালাতে শেখেন না, ব্যাংকে যেতে শেখেন না, নিজে অর্থ উপার্জন করতে শেখেন না। তাই বিয়ে একটা অসম ব্যবস্থা হিসাবেই থেকে যায়। তাই বিয়ের ক্ষেত্রে নারীরা প্রচুর অর্থ আছে এমন ব্যাংক খোঁজেন, আর পুরুষেরা সুন্দরী নিরোগ কম বয়সী জন্মদানক্ষম সন্তান উৎপাদনের মেশিন খোঁজেন। তাই বিয়েতে মেয়েপক্ষ কাবিনের টাকা নিয়ে চেঁচামেচি করেন, তাই বিয়েতে ছেলেপক্ষ যৌতুকের জন্য নির্যাতন করেন।

বিয়ের মত পুরুষতান্ত্রিক প্রথা একদিনে ভাঙা সম্ভব না। তা হয়তো উচিতও না। এবং তার অন্যতম প্রধান কারণ আমাদের শিশুরা। আমাদের গত চার প্রায় পাঁচ হাজার বছরের কালেক্টিভ আনকনশাসনেসে পুরুষতান্ত্রিক পরিবারপ্রথার স্মৃতি জড়িত। হুট করে পরিবার ভাঙা শুরু হলে তার প্রভাব শিশুদের উপর পড়াই স্বাভাবিক। এবং তার ফলশ্রুতিতে সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়াও স্বাভাবিক। তাই বিয়ে প্রথাকে বাতিল বা রিফর্ম করতে হলে সময়ের প্রয়োজন অবশ্যই। এবং এই অন্তর্বতীকালে আমাদের নারী, পুরুষসহ সকল লিঙ্গকে শিক্ষিত এবং আধুনিক হিসাবে তৈরি হতে হবে। আধুনিকতার সংজ্ঞাও নতুনভাবে লিখতে হবে।

আমি যেই সাম্যবাদী সমাজের কথা চিন্তা করি, সেই সমাজের শিশুরা শুধু বাবা মা বা পরিবারের সম্পত্তি নন। তারা সমাজের অংশ। সুতরাং শুধু বাবা মা দাদা দাদী মিলে একজন সন্তানকে পাললে হবে না। একটা সমাজের সকলের দায়িত্ব থাকবে ঐ সমাজের সকল সন্তানকে একযোগে পালার। সমাজে বিয়ের মত একে অন্যকে নিজের সম্পত্তি ভাবার কুপ্রথারও অস্তিত্ব থাকবে না। মানুষ চাইলে একগামিতা বা বহুগামিতায় যুক্ত হবেন। মানুষে মানুষের যেই বন্ধন নামের আপাতঃ ‘ভেইগ’ একটা কথার চালু আছে, সেই বন্ধন সকল মানুষের মধ্যে থাকবে, শুধুমাত্র নির্দিষ্ট দুইজন মানুষের মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সীমাবদ্ধ থাকবে না। আমি পুঁজিবাদের বিরোধী অবশ্যই। কিন্তু পুঁজিবাদের অন্যতম প্রধান উপকারিতা হচ্ছে পুঁজিবাদ সম্পদ তৈরি করতে সক্ষম, যেই সম্পদের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে তুলনামূলক স্বল্প সময়ে জ্ঞান বিজ্ঞন ও প্রযুক্তির উন্নতি সাধিত হয়েছে। আমরা চাঁদে যেতে পেরেছি, থ্রিডি প্রিন্টার আর স্পেস শাটল আর আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স তৈরি করতে পেরেছি, মেডিক্যাল সায়েন্স, জিনেটিক এনজিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্ত হতে পেরেছি। কিন্তু পুঁজিবাদের অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে পুঁজিবাদ শুধুমাত্র একটা ১% শ্রেণির হাতেই অর্থ এবং ক্ষমতা ক্লাস্টার করে রেখেছে। এই সিস্টেমে বিত্তশালীরা আরও বিত্তশালী হয়েছে, দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হয়েছে। আমি যেই সমাজের কথা বলছি, সেই রিফর্মড মিশ্র অর্থনীতির ক্রিপটোকারেন্সি নির্ভর সমাজে পুঁজির ক্ষমতা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মানুষের কাছে থাকবে না, বরং তা ডিজিটাইজড টেকনোলজির হাতে থাকবে। শ্রমিক বলতেও মানুষ থাকবে না, শ্রমিকের জায়গায় আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স থাকবে। মানুষের আয়ের উৎস হবে ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকামের মাধ্যমে।এবং এই রিফর্মেশান কোনো সায়েন্স ফিকশনিয় একশ যুগ পরের আলাপ না, আমি খুব কনভিকশানের সাথে বলতে পারি, এই রিফর্মেশান আর কিছুদিনের মধ্যেই, মাত্র বছর দশেকের মধ্যে শুরু হতে যাচ্ছে, আপনারা লিখে রাখতে পারেন। কেন কনভিকশানের সাথে বলছি, তাও জিজ্ঞেস করতে পারেন।

আমি খুব যুক্তিসঙ্গত কারণে বিশ্বাস করি, করোনা ভাইরাস মানুষের তৈরি করা ভাইরাস না হলেও এর ম্যানিউপুলেশান খুব ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করা ‘দুর্বল’কে সমাজ থেকে সরিয়ে দিয়ে ‘সারভাইভাল অভ দা ফিটেস্ট’ থিওরি বাস্তবায়নের ‘মালথুসিয়ান’ বা ‘হার্বার্ট স্পেনসারিয়ান’ বা ‘ফ্রান্সিস গাল্টনিয়ান’ জাতীয় কুৎসিত সোশাল ডারউনিস্ট রাজনীতির অংশ। করোনা ভাইরাস দিয়ে পৃথিবীর অর্থনীতি কিছুদিনের জন্য হলেও থামিয়ে দেয়াএবং প্যানডেমিকপরবর্তীবিশ্বকে ‘K’ আকৃতির অর্থনীতির দিকে ঠেলে দেয়া এই রাজনীতিকেই স্পষ্টতঃ ইন্ডিকেট করে। আমেরিকান অর্থনীতিবিদ পিটার এ্যাটওয়াটার এই ‘K’ আকৃতির অর্থনীতির কথা প্রথম উল্লেখ করেন। তিনি বলেন- এই‘K’ আকৃতিতে K-এর এক বাহু পৃথিবীর বিত্তশালী এবং নিচের বাহু দরিদ্র শ্রেণিকে রিপ্রেজেন্ট করে। প্যানডেমিক ম্যানিউপুলেশানের অন্যতম কারণ হচ্ছে এই দুই বাহুর মধ্যবর্তী দূরত্ব বাড়িয়ে প্যানডেমিক পরবর্তী বিশ্বে ইলন মাস্ক আর বিল গেইটের মত বিত্তশালীকে আরও বিত্তশালী করা, দরিদ্রকে আরও দরিদ্র করা, সবচাইতে নিচের টিয়ারের কর্মজীবিকে কর্মহীন করা। প্রপার্টি আইনকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে রিয়েল এস্টেটের দাম বাড়ানো এবং একইসাথে অফিস এবং রেন্টাল স্পেইসের দাম কমানো। ওয়ার্ল্ড ইকোনমি ফোরামের মে ২০২০ এর পোস্টে আই-এম-এফের “Worries grow over a K-shaped economic recovery that favors the wealthy” শিরোনামের রিপোর্টও এই অর্থনীতির উত্থানের সমূহ সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে।তাই আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এই প্যানডেমিকেরপেছনে বিশ্ব অর্থনীতিকে ধাক্কা দিয়ে শুধুমাত্র একটা নির্দিষ্ট শ্রেণিকে আরও ক্ষমতাধর করার চেষ্টা ছাড়া আর বিশেষ কোনো কারণ নাই।

তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি জাঁ বাতিস্ত লামাঁখের অনুসারী না হলেও তার প্রি-ডারউনিয়ান এভোলুশানের একাংশের সূত্র ধরেই বিশ্বাস করি, এই ব্যবস্থা- মানুষ, বিশেষতঃ মধ্যবিত্ত মানুষ কোনোভাবেই মেনে নিবেন না। এবং ২০২১ এর শুরু থেকেই সারা পৃথিবীতে বিভিন্ন সামাজিক অর্থনৈতিক আন্দোলন বিপ্লবে রূপ নিবে। এর তার মাধ্যমেই শ্রমকে মানুষের কাঁধ থেকে আর কয়েক যুগের মধ্যেই মুক্ত করা সম্ভব হবে। আর তা করা গেলেই নারী ও পুরুষসহ সকল লিঙ্গ তাদের আয়ুক্ষয়কারী লৈঙ্গিক দায়িত্ব, এই নয়টা-পাঁচটা চাকরি- এই সকাল থেকে রাত অবধি স্বামীসেবা শ্বশুরশাশুড়িসেবা করা- এই চিরজীবনের জন্য রিক্সা ঠেলা- এই আঠারো বছর পর্যন্ত সন্তানের দেখভাল করা- এইসমস্ত কিছু থেকেমুক্তি পাবেন।

প্যানডেমিক কন্সপিরেসির বিপরীতে যদি এই মূহুর্তের মেডিকাল সায়েন্স বা জিনেটিক এনজিনিয়ারিং এর দিকে তাকানো যায়, তাহলেও শুধুমাত্র CRISPR/Cas-9 টেকনোলজি দিয়েই এই ডিজিটাইজেশানের ট্রেন্ডের সংযোগ করা সম্ভব। সংক্ষেপে সহজ বাংলায় যদি এই টেকনোলজিকে ব্যখ্যা করতে হয়, তাহলে বলতে হবে, CRISPR/Cas-9হচ্ছে ব্যাকটেরিয়াফেইজ নামের ভাইরাল ইনফেকশান এবং প্লাসমিড ট্রান্সফার হওয়া ঠেকানোর জন্য ব্যাকটেরিয়া এবং আর্কিয়া গোষ্ঠীর এক ধরণের নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় ব্যাকটেরিয়া বা আর্কিয়ার নিজস্ব গাইড RNA একটি নির্দিষ্ট জিনকে টার্গেট করে এন্ডোনিউক্লিএইয নামক এনজাইমের মাধ্যমে DNA-র ডাবল হেলিকাল স্ট্রাকচার ভেঙে ফেলে ঐ প্রাথমিক জিনোম স্ট্রাকচারের ভিতরে প্রোটোস্পেসার এডজেসেন্ট মোটিফ (PAM) নামের একধরণের ‘স্পেসার’ প্রবেশ করায়। এই মোটিফের মাধ্যমে রেস্ট্রিকশান মডিফিকেশান সিস্টেম আক্রমণকারী ভাইরাসের DNA-র কপি তৈরি হয়, যা ব্যাকটেরিয়া বা আর্কিয়ার ক্রোমোজোমে নতুন ‘স্পেসার’ হিসাবে কাজ করে। আরো সহজভাবে বলতে গেলে, যখন ভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে, তখন ব্যাকটেরিয়া ঐ ভাইরাসের DNA-র কপি তৈরি করে নিজের DNA-তে ঢুকিয়ে ফেলে। ফলতঃ ঐ ভাইরাস আর ঐ ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করতে সমর্থ হয় না। তো এখন আপনি বলতে পারেন, হ্যাঁ, বুঝলাম। খুব ভালো কথা। কিন্তু তাতে হয়েছেটা কী?

কী হয়েছে তা বলছি।

১৯৮৭ সালে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার Cas-9জিনে সর্বপ্রথম CRISPR স্ট্রাকচার পাওয়া যায়। কিন্তু তখনও বিজ্ঞানীরা এই জিনিসের সম্পূর্ণ মর্মার্থ ধরতে পারেন নাই। এইবছর, অর্থাৎ ২০২০ সালেCRISPR/Cas-9টেকনোলজির মাধ্যমে জিন এডিট করার পদ্ধতি ডেভেলপের জন্যকেমিস্ট্রিতে নোবেল পুরষ্কার পান জার্মানির ইমানুয়েল কারপেন্টিয়ার এবং আমেরিকার জেনেফার ডাডনা। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে প্রতিবছর অক্টোবর মাসে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়। আর ২০২০ অক্টোবর থেকেই এই CRISPR/Cas-9টেকনোলজি নিয়ে মিডিয়ায় হৈচৈ শুরু হয়। এই হৈচৈ এর প্রধান কারণ এই টেকনোলজির যে বিপুল সম্ভাবনা আছে, এই টেকনোলজি যে শুধুমাত্র সিকেল সেল এনিমিয়া, থ্যালাসামিয়া, ক্যান্সার, এইডস, ম্যালেরিয়া, ডায়াবিটিস থেকে শুরু করে পৃথিবীর তাবত জিনেটিক এবং নন-জিনেটিক রোগ অতি অতি অতি অল্প ব্যায়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় সারাতে সক্ষম, তাই না, এর মাধ্যমে যেভাবে আমরা পৃথিবীকে ক্ষুধামুক্ত করতে পারবো, মানুষের বয়স বাড়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো, চাইলে মৃত্যু ঠেকাতে পারবো, চাইলে খেতে হয় না, ঘুমাতে হয় না এমন সুপার-সোলজার তৈরি করতে পারবো; এই টেকনোলজি দিয়ে যে আক্ষরিক অর্থে আমরা সায়েন্স ফিকশানের যুগে ঢুকতে পারবো, তা অনুধাবন করা। আমি লিখে দিতে পারি, আগামী এক যুগের মধ্যে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা, আমাদের মেডিকাল সায়েন্সের ক্ষেত্রে ভয়ংকর ধরণের পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। এবং এর ফলশ্রুতিতে শুধুমাত্র সাময়িক ব্যথানাশক অসুধ তৈরি বাদে ফার্মাসিউটিকাল ইন্ডাস্ট্রি আর কিছুদিনের মধ্যেই পুরাপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ পার্সোনালাইজড এবং একই সাথে ডিজিটাইজড হয়ে যাবে।

(বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ গতকালকেই CRISPR/Cas-9 টেকনোলজির মাধ্যমে সিকেল সেল এনিমিয়ার মত অসুখ সারাতে সমর্থ হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। যা গত একশ বছর ধরে পৃথিবীব্যপী মিলিয়নের বেশি মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী।)

মেডিকাল সায়েন্স ছাড়াও আরও অন্যান্য বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে একই ট্রাজেকটরি ট্রেন্ডের উদাহরণ পাওয়া যায়। প্রায় ৬০০ বছর আগে মানুষ তার মৌখিক গল্প বলার সংস্কৃতি থেকে প্রিন্টিং প্রেসের মাধ্যমে লিখিত দুনিয়ায় প্রবেশ করে। আমাদের কারেন্সি এবং মেডিক্যাল সিস্টেম ডিজিটাইজড হয়ে যাওয়ার পরে আমাদের এই কাগজে লেখার দুনিয়াও বাতিল হয়ে যাবে। আর তার চিহ্ন আমাদের চোখের সামনেই আছে। বইয়ের জায়গায় কিন্ডেল এবং পৃথিবীর সমস্ত কাগজে লেখা বইয়ের অনলাইন পিডিএফ ভার্শান তৈরি হওয়া এই রিফর্মড ডিজিটাইজড পৃথিবীর ইন্ডিকেশান দেয়।

এখন আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, ওকে। কিন্তু এই নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারের সাথে নারীবাদের ভূমিকা কী?

ভূমিকা হ্যাজ।

এই রিফর্মড সমাজের ট্রানজিশানের জন্য অন্যান্য লিঙ্গের পাশাপাশি নারীদের, এবং সর্বপ্রথম নারীদেরকেই তাদের প্রাচীন মান্ধাত্মা চিন্তাপদ্ধতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। খেয়াল করলে দেখবেন, সমাজের নারীরাই এবং বিশেষতঃ মধ্যবিত্ত শ্রেণির নারীরাই যেকোনো নতুন জিনিসের, নতুন চিন্তার ক্ষেত্রে সবচাইতে বেশি বিরোধিতা করেন, প্রথম প্রতিরোধ নারীদের মধ্য থেকেই আসে। নারীদের প্রবল প্রতিরোধের মুখেই ঔপনিবেশিক আমলে ইওরোপীয় পোশাক উপমহাদেশে নারীর আলমারিতে ঢুকতে পারে নাই। পৃথিবীর যেকোনো আন্দোলন খেয়াল করলে দেখবেন, যেকোনো যুগ খেয়াল করলে দেখবেন, পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার মুখে দাঁড়িয়েও নারী, নারী শরীর এবং নারীর পোশাক সেই আন্দোলনের বা সেই যুগের ইন্ডিকেটার হিসাবে কাজ করেছে। গ্রেট ডিপ্রেশান বলেন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভোলুশান বলেন, বিশ্বযুদ্ধ বলেন, এমনকি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বলেন, নিজ সংস্কৃতিতে কী থাকবে বা কী থাকবে না তা নির্ধারণ করেন নারীরা, বিশেষতঃ মধ্যবিত্ত নারীরা। এবং এই কারণেই মধ্যবিত্ত নারীরাই পুরুষতান্ত্রিকতারও প্রধান ধারক বাহক ও কর্ণধার। মধ্যবিত্ত নারীরাই বেশিরভাগক্ষেত্রে সামাজিক লুব্রিকেশান ‘পরনিন্দা এবং পরচর্চা’র মাধ্যমে, অমুকের স্বামীর পরকীয়া, অমুকের খালাতো ভাইয়ের চাচাতো দেবরের দারোয়ানের নাতির মামাতো বোনের ওড়না ছাড়া রিক্সায় বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঘুরতে ঘুরতে বাদামভাজা খাওয়ার গল্প চালু রাখার মাধ্যমে, বিয়ে প্রথাকে টিকায়ে রাখার, বিবাহবিচ্ছেদের বিরোধিতা করার মাধ্যমে সমাজ নিয়ন্ত্রণ করেন। নজরুলের একটা কবিতা আছে না? “রাজা করিতেছে রাজ্য-শাসন, রাজারে শাসিছে রাণী, রাণীর দরদে ধুইয়া গিয়াছে রাজ্যের যত গ্লানি-” মধ্যবিত্ত নারীরা হচ্ছেন ঐ রাণী। ক্ষমতাদের হাতে না থাকলেও ক্ষমতার আপাতঃ নিয়ন্ত্রণ মূলতঃ তাদেরই হাতে।

এবং এই কারণেই আমার নারীবাদ মধ্যবিত্ত নারীর চিন্তাপদ্ধতিকে পাল্টানোতে সীমাবদ্ধ। আমি এনজিও করি না, তার সামর্থ্য বা ইচ্ছা কোনোটাই আমার নাই। আমি দরিদ্র প্রান্তিক নারীদের ‘উন্নতি’ নিয়েও কাজ করি না। কারণ আমি বিশ্বাস করি, পুঁজিবাদী সমাজের যেই ‘টপ-ডাউন’ অবস্থায় আমরা থাকি, তাতে দরিদ্র নারীকে শিক্ষিত করেও, তাদেরকে অধিকার সচেতন করেও, তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন করেও সমাজ পরিবর্তন সম্ভব না। আমি এমনকি ‘টপ-ডাউন’-এর বিপরীতে ‘বটম-আপ’ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক চিন্তা করি না। এই দুই অবস্থা হেগেলীয় থিসিস এবং এ্যান্টি থিসিস হিসাবে কাজ করে, এবং এই দুই অর্থনৈতিক অবস্থার একটাও সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম না। আমি বিশ্বাস করি, সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা পেতে পারে নারী পুরুষসহ সকল লিঙ্গের মানুষকে শ্রমিক হিসাবে মুক্ত করার মাধ্যমে। এবং তা সম্ভব শুধুমাত্র আমাদের শ্রম ও সম্পদের ডিজিটাইজেশানের মাধ্যমে। টাকাকে কাগজ থেকে মুক্ত করার মাধ্যমে। কমোডিটি ফেটিশিজম থেকে বের হয়ে পুঁজিবাদ এবং সমাজতন্ত্রকে এক করে মিশ্র অর্থনীতি তৈরি করার মাধ্যমে। গ্লোবাল অর্থনীতিকে লোকাল অর্থনীতিতে রূপান্তর করার মাধ্যমে। ধর্মীয় ও সামাজিক গোত্রপ্রথা থেকে মুক্ত হবার মাধ্যমে।

এবং এই সামাজিক রূপান্তরকে সহজ করতে মধ্যবিত্ত নারীর ভূমিকা সবচাইতে বেশি। শিক্ষার প্রসার বলেন আর দারিদ্র দূরীকরণ বলেন, এইগুলি দিয়ে আমরা গত একশ বছরে কিছুই করতে সমর্থ হই নাই। ইওরোপ বা আমেরিকায় শিক্ষার হার প্রায় ১০০ শতাংশ হলেও তারাও পুরুষতান্ত্রিকতা মুক্ত না। ধর্ম থেকেও পৃথিবীর কোনো আধুনিক রাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে মুক্ত না। এবং তা করা সম্ভবও না। তাই সাম্যবাদী সমাজ তৈরি করতে হলে আমাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ডিজিটাইজড করতেই হবে। এবং এই পরিবর্তনকে ধারণ করার জন্য প্রথম আর্থ-সামাজিক-লৈঙ্গিক শ্রেণি হবেন মধ্যবিত্ত নারী।

আর তাই উচ্চবিত্ত বা নিম্নবিত্তের আগে মধ্যবিত্ত নারীকে তার রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অধিকারের আগেও তার শরীরের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। তাকে পিরিয়ড নিয়ে কথা বলতে শিখতে হবে, ওড়না নিয়ে কথা বলতে শিখতে হবে, তাকে জানতে হবে তিনি কাকে এবং কখন তার শরীর ব্যবহার করতে দিবেন, তাকে নিজ শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়া শিখতে হবে। তাকে জানতে হবে, একগামিতা বা বহুগামিতা সমাজের নির্ধারণ না, বরং তা একান্তভাবেই তার নিজের সিদ্ধান্ত। তিনি বিয়ে করবেন কিনা, কখন করবেন, কাকে করবেন, সেটাও তার জানতে হবে। একইসাথে তিনি যেন পুরুষতান্ত্রিক না হয়ে যান, তিনি যেন অধিকার সচেতন হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার না করেন, পুরুষকে নিজের শত্রু বা দাস মনে না করেন, সিস্টেমের অপব্যবহার না করেন, নারী-কার্ড বা ভিকটিম-কার্ড না খেলেন, সমতার প্রশ্নে দ্বিচারিতা না করেন, বিয়ের ক্ষেত্রে টাকাবহুল বিসিএসবহুল আমেরিকান-কেনেডিয়ান মেডিক্যাল এনজিনিয়ারিং ব্যাংক না খোঁজেন, তাও মেইক শিওর করতে হবে।

কারণ শরীরের অধিকার সচেতন নারী রাজনীতি এবং অর্থনীতি এবং সমাজনীতি সচেতন নারী। যেই নারী তার শরীর নিয়ে সচেতন না, তার পক্ষে পৃথিবীর রাজনীতিও বোঝা সম্ভব না।

অনেকেই বলেন, ‘আমার’ নারীবাদ সমাজের বিচারে আপত্তিজনক। আমি তা মাথা পেতে একবাক্যে স্বীকার করি। এবং তার সাথে এটাও বলি, পৃথিবীর সকল নারীবাদই সমাজের বিচারে আপত্তিজনক ছিল। সতিদাহের বিরোধিতা, বাল্যবিবাহের বিরোধিতা, বিধবাবিবাহের জন্য আন্দোলন করা, কোনটা সমাজের জন্য আপত্তিজনক ছিল না? নারীবাদ কোনো ফুল-লতা-পাতা-পাখি নিয়ে প্রেমময় আহাউহু গান গাওয়ার, সংখ্যাগুরু প্রভুকে মুগ্ধ করার, আনন্দিত করার, তুষ্ট করার, সমর্পিত হওয়ার আন্দোলন না। এই আন্দোলন সমাজের গায়ে বেমক্কা ধাক্কা দেয়ার আন্দোলন, সমাজকে কান ধরিয়ে শেখানোর আন্দোলন যে সমাজ ঠিক রাস্তায় চলছে না। এই আন্দোলন কোনো পুতুপুতু ধরণের মানুষের আন্দোলন না, এই আন্দোলন তাদের জন্য না, যারা বে**শ্যা গালি শুনে, নিজের নামে প্রতিদিন একগাদা মিথ্যা প্রপাগান্ডা শুনে, অপরিচিত মানুষের কাছে নিজের নামে কুৎসিততম অপপ্রচার শুনে, অন্যের হাসির পাত্র হয়ে পিঁউপিঁউ কান্নাকাটি করে ভেঙে পড়েন, আত্মহত্যা করতে পকেটে পাথর নিয়ে বঙ্গোপসাগরে চলে যান।

পৃথিবীর কোনো রাজা রামমোহন রায়, পৃথিবীর কোনো চার্লস ফুরিয়ার, পৃথিবীর কোনো সিমোন দা বিভোঁওয়া, কোনো মেরি ঔউলস্টোনক্রাফট, কোনো বেল হুকস, কোনো এলিস ওয়াকার, পৃথিবীর কোনো বেগম রোকেয়া গালি না শুনে, কাঁটা বিছানো রাস্তার উপর দিয়ে না হেঁটে তাদের অবস্থানে পৌছান নাই। আর এই কাজ তারা নিজেদের দুই টাকার খ্যাতির জন্য করেন নাই, মানুষের জন্য করেছেন, যারা আজকের দিনে তাদের অবদান সকাল বিকাল উপভোগ করছেন এক লাইন চিন্তা করা ছাড়াই। আর আমি এঁদেরই উত্তরসূরী। তাই আমি গালি শুনতেও প্রস্তুত। তাই আমি আমার বহুগামী যৌন জীবনের ছবি আপলোড করেই যাবো, যৌনতা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেই যাবো, আরও একলক্ষবার বে**শ্যা হব, আরও একলক্ষবার নিজের নামে কুৎসিত প্রপাগান্ডা শুনবো, কিন্তু তাতে আমার যৌনাঙ্গের কেশাগ্র ছেঁড়া যাবে না।

রিচার্ড ফাইনম্যানের খুব বিখ্যাত একটা পেপার আছে, আমার খুব প্রিয়। পেপারটার নাম ‘প্রিনসিপাল অভ লিস্ট এ্যাকশান’। এখানে বলা হয়, প্রকৃতির একটা অস্বাভাবিক ক্ষমতা আছে। প্রকৃতি সবসময়েই সবচাইতে কম ‘এ্যাকশানে’ সবচাইতে কম সময়ে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌছায়। এই এ্যাকশান হচ্ছে কিনেটিক এনার্জি থেকে পোটেনশিয়াল এনার্জির সমষ্টির বিয়োগফল। আমরা আগামী কয়েক বছরে পৃথিবীতে যুদ্ধের মাধ্যমে, দাঙ্গার মাধ্যমে, আন্দোলন, বিক্ষোভ এবং বিপ্লবের মাধ্যমে সেই কিনেটিক এনার্জির প্রকাশ দেখবো। তবে আমি অপটেমিস্টিক মানুষ অবশ্যই। আমি বিশ্বাস করি, আর্টিফিশিয়ালি যতই অর্থনীতিকে ম্যানিউপুলেট করা হোক না কেন, যতই ধর্মীয় উগ্রবাদ তৈরি হোক না কেন, যতই নারীবাদীদের গালি দেয়া হোক না কেন, যতই অসমতা তৈরির চেষ্টা হোক না কেন, প্রকৃতি নিজ গতিতে তার ‘হোমিওস্টেসিস’ নিজেই খুঁজে নিবে।

কারণ নারী ও পুরুষ ও সকল লিঙ্গের মানুষের মত, প্রকৃতি সমতাতে বিশ্বাস করে। প্রকৃতিতে কেউ কারুর চাইতে বড় নয়, কেউ কারুর চাইতে ছোট নয়। প্রকৃতিতে সবাই, নারী পুরুষ ট্রান্সজেন্ডার মুসলমান ইহুদি খ্রিশ্চান বৌদ্ধ শাক্ত বৈষ্ণব নাস্তিক আস্তিক শিক্ষিত অশিক্ষিত বাঙালী চাকমা মারমা গরু ছাগল কুকুর বেড়াল কাক মাটি পানি বাতাস সবাই একে অন্যের পরিপূরক। কাকের গুরুত্ব বাতাসের চাইতে কম না। মানুষের গুরুত্ব মাটির চাইতে বেশি না।

' src='https://nariblog1da1d.zapwp.com/q:intelligent/retina:false/webp:false/w:1/url:https://nari.blog/wp-content/uploads/2020/12/o-85x85.jpg' srcset='https://nariblog1da1d.zapwp.com/q:intelligent/retina:false/webp:false/w:1/url:https://nari.blog/wp-content/uploads/2020/12/o-170x170.jpg 2x' class='avatar avatar-85 photo' height='85' width='85
লিখেছেন
নাদিয়া ইসলাম

লেখক, গবেষক, ভিগান, অজ্ঞেয়বাদী, বিড়ালপ্রেমিক, নারীবাদী এবং কনস্পিরেসি থিওরির একনিষ্ঠ ভক্ত। জন্ম ১৯৮৫ সালে।

সব পোস্ট দেখুন
মন্তব্য করুন

' src='https://nariblog1da1d.zapwp.com/q:intelligent/retina:false/webp:false/w:1/url:https://nari.blog/wp-content/uploads/2020/12/o-85x85.jpg' srcset='https://nariblog1da1d.zapwp.com/q:intelligent/retina:false/webp:false/w:1/url:https://nari.blog/wp-content/uploads/2020/12/o-170x170.jpg 2x' class='avatar avatar-85 photo' height='85' width='85 লিখেছেন নাদিয়া ইসলাম