তথ্য প্রযুক্তি

তথ্য প্রযুক্তি কি

তথ্য প্রযুক্তি।শব্দ দুটি কানে এলেই চোখে ভাসে এক বিস্ময়কর তথ্য ভান্ডার – কম্পিউটার। ঠিক যেন দুজনে দু’জনার।

আধুনিক ভাবধারায় ব্যবসায়ীক পরিমণ্ডলে কম্পিউটার এবং এর নেটওয়ার্কগুলি মানুষের সুবিধাজনক ব্যবহারের কার্য সাধন প্রণালীর সম্মিলিত রূপকে সাধারণ ভাবে তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি হিসাবে অভিহিত করা হয়।এর প্রায়োগিক বিষয়গুলো যেমন তথ্য-উপাত্ত স্থানান্তর,পুনঃস্থাপন,পরিচালন,বিনিময়,অধ্যয়ন ইত্যাদি বিষয়গুলোকে সুরক্ষিত ভাবে সংরক্ষন করে। টেলিভিশন,টেলিযোগাযোগ,সফটওয়্যার,ই-বাণিজ্য এবং ইন্টারনেটকে বৈদ্যুতিন ভাবে (ইলেক্ট্রনিক্যালি)এক ছাতার নীচে সন্নিবেশিত করা থাকে।

সুমেরীয় অগ্রদূত গণ প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় প্রায় 3000 খ্রিস্টপূর্বে লিখন পদ্ধতি আবিষ্কার করলেও বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত আইটি বা তথ্যপ্রযুক্তি নামক কোন শব্দের অবতারণা হয় নি।১৯৫৮ সালে হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ এ Harold J. Levitt এবং Thomas C.Whisler প্রথম লিখেছিলেন যে এই প্রযুক্তির অদ্যাবধি কোন প্রতিষ্ঠিত নাম নাই এবং তারা এটাকে ইনফরমেশন টেকনোলজি বা তথ্য প্রযুক্তি বলে নামকরণ করার প্রস্তাব করেন।

তথ্য প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ মেশিন ও নেটওয়ার্ক সমূহের সংক্ষিপ্ত উদ্ভাবনী সময়কাল

খ্রিস্টপূর্ব ২৪০০ সালে ব্যাবিলনে ‘অ্যাবাকাস’ নামের প্রথম ক্যালকুলেটর উদ্ভাবনের মাধ্যমে যে জয়যাত্রার শুরু হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক শতাব্দিতে তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক উত্তরণ ঘটে।
উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে অগাধ পাণ্ডিত্য অধিকারী ও ইংরেজ যন্ত্র প্রকৌশলী চার্লস ব্যাবেজ সর্বপ্রথম যান্ত্রিক কম্পিউটার ডিভাইস আবিষ্কার করেন যা মূলত সামুদ্রিক সীমানা নির্ণয়ের সহায়ক ‘পৃথক ইঞ্জিন’ নামে অভিহিত।
কম্পিউটারের জনক বলে খ্যাত চার্লস ব্যাবেজ ১৮৩৩ সালে নেভিগেশন ছাড়াও অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যবহারপোযোগী অধিকতর উন্নত ‘এনালাইটিক্যাল এন্জিন’ উদ্ভাবনের শেষ পর্যায়ে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারনে তার পরিপূর্ণ রূপ দিতে পারেননি।ব্যাবেজের মৃত্যুর পর তার পুত্র হেনরি ১৮৮৮ সালে মেশিনটির আরও সহজ সংস্করণ উদ্ভাবন করে ১৯০৬ সালে জনসাধারনের সম্মুখে সাফল্যের সাথে উপস্থাপন করেন।
ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত প্রাথমিক পর্যায়ের কম্পিউটার সমূহ যথাযথ ভাবে বিকাশ লাভ করেনি।
কিন্তু যখন ত্রিভুজের কোণ ও রৈখিক পরিমাপে ব্যবহৃত কম্প্যাক্ট এনালগ ইলেক্ট্রোম্যাকানিকাল কম্পিউটার আবিষ্কৃত হয় তখন তা ধাবমান লক্ষ্যবস্তুতে টর্পেডোর আঘাত হানতে সাবমেরিনে স্থাপন করা হয়েছিল। ১৯৩৯ সালে প্রকৌশলী Konrad Zuse ‘Z টু’ নামের প্রথম electro-mechanical ডিজিটাল কম্পিউটার আবিষ্কার করেন যা বৈদ্যুতিক সূচক সম্বলিত ড্রাইভে ও হিসাব নিরূপণে ব্যবহার হতো। Z2 এর মত ডিভাইসের ধীর গতির পরিচালন পদ্ধতি অবশেষে সর্বপ্রথম zuse কর্তৃক ১৯৪১Z3 নামে দ্রুতগতির সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় মেশিন আবিষ্কৃত হয়।১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৪৫ এর মধ্যে Colossus সর্বজন স্বীকৃত বিশ্বের সর্বপ্রথম প্রোগ্রামযোগ্য ইলেকট্রিক ডিজিটাল কম্পিউটার উদ্ভাবন করেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই রহস্যময় যন্ত্রের মাধ্যমে জার্মানদের গোপন সাংকেতিক বার্তার পাঠোদ্ধার করে এটিকে তিনি জনপ্রিয় করে তোলেন। ১৯৩৬ সালে ইংরেজ কম্পিউটার বিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ এবং তাত্ত্বিক জীববিজ্ঞানী Alan Turing তার মৌলিক প্রবন্ধ ‘On computable Numbers’ এ আধুনিক কম্পিউটারের ধারণাসূচকে উল্লেখ করেন যে প্রোগ্রামযোগ্য নির্দেশনা এই যন্ত্রের স্মৃতিতে সংরক্ষণ করা সম্ভব।
প্রাথমিক পর্যায়ের আরেকটি প্রোগ্রাম যোগ্য কম্পিউটার হল ‘Manchester Mark1’ যা ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অফ ম্যানচেস্টার কর্তৃক উন্নত করা হয়েছিল।
১৯৪৮ সালের আগস্টে Frederic C.Williams,Tom kilburn এবংGeoff Till এই যন্ত্র নিয়ে কাজ শুরু করেন।কিন্তু ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত এই কম্পিউটারের সংস্করণ ব্যবহার যোগ্য হয়নি।
Manchester Mark1 কে বৃটিশ সংবাদমাধ্যম ‘বৈদ্যুতিন মস্তিষ্ক’আখ্যা দিলে তা ম্যানচেষ্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসার্জারি বিভাগের সঙ্গে এক দীর্ঘ মেয়াদী বিতর্কের জন্ম দেয়।তারা জানতে চান যে একটি বৈদ্যুতিন কম্পিউটার বাস্তবিকই সৃষ্টিশীল হতে পারে কি-না।

১৯৫১ সাল নাগাদ ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি Ferranti International Plc কর্তৃক উদ্ভাবিত Ferranti Mark1 নামক কম্পিউটার বাণিজ্যিকভাবে সার্বজনীন উদ্দেশ্যে ব্যবহারযোগ্য করে এবং এটার প্রথম ব্যবহারকারী ছিল ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অফ ম্যানচেস্টার।

  • Lyons Tea Corporation তাদের ব্যবসায়িক বিস্তার বাড়াতে ১৯৫১ সালে কম্পিউটারে প্রথম বানিজ্যিক এপ্লিকেশন যুক্ত করে নাম দেয় ‘Leo l’
  • বার্তা আদান-প্রদানের যুগান্তকারী ই-মেইল আবিষ্কৃত হয় ১৯৭১ সালে।
  • জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থানকারী পার্সোনাল কম্পিউটার আবিষ্কার করেন Xerox ১৯৭৩ সালে।
  • Sir Tim Berners Lee তার যাদুকরী উদ্ভাবন World Wide Web( ইন্টারনেট)নিয়ে আসেন ১৯৮৯ সনে।
  • ১৯৯০ সালে আবিষ্কৃত হয় প্রথম সার্চ ইঞ্জিন Archie.
  • ১৯৯২ সালে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় তথ্য প্রযুক্তি।
  • পরবর্তী বছর গুলোতে গুগল,এপল, ওয়ার্ড প্রেস, ফেসবুক,ইউটিউব,এমাজন,বিটকয়েন ইত্যাদির মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে তথ্য প্রযুক্তি।
  • তথ্যপ্রযুক্তির প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্ভাবন গুলিকে এখানে সন্নিবেশিত না করলে এর ধারাবাহিক কার্যক্রম এর বর্ণনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
  • বাস্তবিক ভাবে মানব সভ্যতা গড়ে উঠেছে তথ্যপ্রযুক্তির হাত ধরে।এমনকি আদি লগ্নে এই বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের সুশৃঙ্খল সৃষ্টিতেও রয়েছে প্রযুক্তির ছোঁয়া।

এরপরে মানুষের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার এর মধ্যে অন্যতম হলো-

  • ১৮৩৮ সালে charles Wheatstone এবং স্যামুয়েল মোর্স আবিষ্কার করেন ইলেকট্রিক টেলিগ্রাফ। এর আগে ১৮৩৫ সালে মোর্সকোড আবিষ্কৃত হয়েছিল স্যামুয়েল মোর্সের হাতে।
  • ১৮৪৩ সালে টাইপরাইটার উদ্ভাবন করেন Charles Thurber
  • ১৮৭৭ এ Emile Berliner আবিষ্কার করেন মাইক্রোফোন।
  • ১৮৮৮ সালে বেতার তরঙ্গের আবির্ভাব হলো বিজ্ঞানী Hertz এর দ্বারা।
  • ১৮৯৬ সালে তারবিহীন যোগাযোগ ওয়ারলেস উদ্ভাবন করেন নিকোলা টেসলা।তার হাতেই আবিষ্কৃত হয় রিমোট কন্ট্রোল ১৮৯৮ সালে।
  • ১৮৯৫ এ Guglielmo Marconi আবিষ্কার করেন বেতার সংকেত।
  • ১৯২৩ সালে ইলেকট্রনিক টেলিভিশন এলো Philo Fransworth এর আবিষ্কারে।
  • Basil Hirschowitz,C.Wilbur Peters এবং Lawrence E.Curtis এর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আবিষ্কৃত হয় অপটিক্যাল ফাইবার।

কর্মক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার

কোন কোম্পানির আকার যাই হোক না কেন তথ্যপ্রযুক্তির দৃশ্যমান ও অদৃশ্য প্রায়োগিক ক্ষমতা এর ব্যবসায়িক পরিধির সঙ্গে সর্বত্রই যুক্ত থাকতে পারে।যোগাযোগ,দক্ষতা,পরিবর্তন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি সবকিছুই তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রভাবিত হয়। ব্যবসায়িক কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালনা বা উদ্ভূত কোনো সমস্যার সমাধান তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে আভ্যন্তরীণ অথবা বহিঃউৎসায়ন থেকে সমাধান সম্ভব।

যোগাযোগ

অফিস কর্মীগণ লিখিত পত্র যোগাযোগ কিংবা টেলিফোন বার্তার জন্য অফিসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনা। ই-মেইলের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে তারা প্রাপকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। ই-মেইলের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোন প্রান্তের ক্রেতা বা গ্রাহকের চাহিদা মাফিক প্রয়োজনীয় পণ্যের সেবাদানে দ্রুততার সাথে যোগাযোগ করা যায়।
ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অফিসের নির্ধারিত সময় ছাড়াও গ্রাহকগণের মতামতের ভিত্তিতে চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থানে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যায়।অধিকন্তু সহকর্মী ও ভোক্তার সঙ্গে সরাসরি বার্তা আদান-প্রদান করার সুযোগ থাকে।

দক্ষতা

তথ্যপ্রযুক্তি কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করে। ই-মেইল, ওয়েবসাইট, ল্যাপটপ ইত্যাদি ব্যবহারে সময়ের সর্বোত্তম সদ্ব্ ব্যবহার নিশ্চিতের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে।ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ পদ্ধতি অফিস পরিসরের এবং কাগজ ও ছাপা খরচ কমিয়ে দেয় ।এছাড়া একটি ছোট্ট বোতামে আঙ্গুলের ছোঁয়ায় যে কোনো পরিবর্তন, পরিবর্ধন,পরিমার্জন সাধন করা সম্ভব ।এই সকল সুসংবদ্ধ বিষয়াবলী একত্রীকরণের মাধ্যমে কর্ম জীবন হয়ে ওঠে সহজতর,গতিশীল এবং দক্ষ যা সাশ্রয় করে সময় এবং অর্থ।

গতিশীলতা

কয়েক দশক আগেও কম্পিউটারে দলীয়ভাবে একসাথে কাজ করতে হতো যা ছিল একেবারে স্থবির ও ব্যয়বহুল। বর্তমানে ডিভাইসের আকার ছোট ও বহনযোগ্য হওয়ায় একজন কর্মী অফিসের বাইরের যে কোনো দূরত্ব থেকে অন্যের সহযোগিতা ছাড়া একাই কর্ম সম্পাদন করতে পারে ফলে ভ্রমণ ব্যয় অনেকাংশে কমে যায়।
ডাটা সংরক্ষণ পদ্ধতিতে একটি প্রতিষ্ঠান পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশে কম খরচে ছোট্ট অফিস স্থাপনের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারে।দেশ-বিদেশের যেকোন স্থান থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কর্মীগণ একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং এভাবেই তথ্যপ্রযুক্তি উৎপাদনশীলতার সম্প্রসারণ করে দ্রুততার সঙ্গে নানামুখী কল্যাণ বয়ে আনে।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি

তথ্যপ্রযুক্তির সুবিশাল পরিসর কোম্পানির কর্মসংস্কৃতি উন্নয়নে ফাইল শেয়ারিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে কর্মীগণ একত্রে কাজ করতে পারে এবং পৃথিবীর যেকোন প্রান্ত থেকে ব্যবসার গতিধারা অনুধাবন ও বিশ্লেষণ করতে পারে। এছাড়াও আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজের জন্য অন্য কারোর অপেক্ষায় থাকতে হয় না এবং কর্মীদের বিরোধ,অদক্ষতা এবং হতাশা সহজেই দূর করে কর্মীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

লিখেছেন
নীলকণ্ঠ

আমি নীলকন্ঠ! বিজ্ঞানে বিশ্বাসী। কারণ বিজ্ঞান সত্য খুঁজে পাবার চেষ্টায় লিপ্ত। আমি শারিরীকভাবে একটি লিঙ্গের প্রতিনিধি, কিন্তু মানসিক ভাবে আমি দুটি লিঙ্গেরই প্রতিনিধিত্ব করি।

সব পোস্ট দেখুন
মন্তব্য করুন

লিখেছেন নীলকণ্ঠ