ঈদ

ঈদ-সম্মিলন

সংবৎসর পরে আবার ঈদ আসিল। আজি আনন্দের দিন উৎসবের দিন , সমুদয় মোসলেম সমাজের সম্মিলনের দিন।

সারা বৎসরের অবসাদের পর আজি উৎসাহের দিন আসিয়াছে। যেন বসন্ত-সমাগমে মানবের গৃহরূপ কাননে অসংখ্য প্রীতি-কুসুম ফুটিয়াছে। বালক-বালিকার দল ত মনে করে, ঈদ না জানি কি! আর তাহাদের অভিভাবকেরাও কি আত্ম-বিস্মৃত হইয়া তাহাদের আনন্দ-কোলাহলে যোগদান করেন না? আজিকার এ আনন্দ-প্রবাহের ধণির অট্টালিকা ও দরিদ্রের দীনতম কুটির একই ভাবে প্লাবিত।

ঈদের নামাজের মূলে কি মহান ঐক্য লক্ষ্যিত হয়। সহস্র সহস্র লোক একই কাবাশরীফ লক্ষ্য করিয়া শ্রেনীবদ্ধ হইয়া নামাজে দাড়াইয়াছে; -সকলে একই সঙ্গে ওঠে, একই সঙ্গে বসে, –একই সঙ্গে সহস্রাধিক মস্তক প্রভুর উদ্দেশে আনত হয়। তারপর? তারপর, নামাজ সমাপ্ত হিলে পর সকলে ভাতৃভাবে পরস্পরকে আলিঙ্গন করে। কি সুন্দর ভাতৃভাব। যাহারা প্রতিবেশীর প্রতি এতদিন কোনরূপ বিদ্বেষভাব পোষণ করিত, তাহার আজি সে হিংসাদ্বেষ ভুলিয়া গিয়াছে। আজি মসজিদে ছোট-বড়-ধনী-নির্ধন এক যোগে সম্মিলিত হইয়াছে! এ দৃশ্য কি চমৎকার! এ দৃশ্য দেখিলে চক্ষু পবিত্র হয়, ক্ষুদ্র স্বার্থ, নীচ ঈর্ষা লজ্জায় দূরীভূত হয়, নিরানন্দ, মৃতপ্রায় প্রাণে সঞ্জীবনী শক্তি সঞ্চারিত হয়। জাপানে একতা আছে সত্য, কিন্তু আমাদের এ অপার্থিব একতার তুলনা কোথায়? বতসরের শুভদিনে এমন শুভ-সম্মিলন কোথায়?

কালের আবর্ত্তনে এইরূপ আরও অনেক ঈদ আসিয়াছে; আরো অনেকবার মোসলেম ভাতৃগণ এমনই ঈদের নামাজে যোগ দিয়াছেন, আরো অনেক বৎসর ঈদের নবীন চন্দ্র তাঁহাদের প্রাণে এমনই করিয়া ঐক্য জাগাইয়া দিয়াছে। কিন্তু দিবাশেষে ঈদ রবির অন্তগমনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ভাতৃভাবও ম্লান হইয়াছে। যেন প্রতি বৎসর ঐক্যরূপ অমূল্য রত্নটি আমরা মসজিদ প্রাঙ্গণে রাখিয়া আসি। অথবা একতা যেন মসজিদ প্রাচীরের অব্যন্তরে আবদ্ধ থাকে! বলি, এ বৎসর এ বিংশ শতাব্দীর সভ্যযূগেও কি আমাদের ঈদ-সম্মিলন দিবাশেষে বিস্মৃতির গর্ভে বিলীন হইবে? না, এবার আমরা একতা সযত্নে রক্ষা করিব।

একতা মহাশক্তি, একতা আমাদের ধর্ম্মের মূল,-আমাদের সমূদয় ধর্ম্ম-কর্ম্মেই অঈক্য নিহিত আছে। জানি না, কোন দস্যু (আমাদিগকে অজ্ঞান-তিমির নিশীথে নিদ্রিত পাইয়া) আমাদের মহামূল্য একতানিধি অপহরণ করিয়াছে। জানি না, কাহার অভিশাপে আমরা অভিশপ্ত হইয়াছি। তাই এখন আমরা সহোদরের সহিত মল্লযুদ্ধ করি, সহোদরার সহিত হিংসা করি, পুত্র-কন্যার অমঙ্গল কামনা করি। আমাদের ঘরে ঘরে আত্মকলহ লাগিয়া আছে। যাহাদের গৃহে পিতাপুত্রে বিবাদ, ভ্রাতায় ভ্রাতায় বিরধ, তাহার সমস্ত সমাজটিকে “আপন” ভাবিতে পারিবে কিরূপে?

ঈদ-সমাগমে আজি আমাদের সে দুঃখ যামিনীর অবসান হউক। ঈদের বালার্কের সহিত আমাদের অন্ধকার হৃদয়ে নব-আশার নবনূর উদ্দীপক হউক। সমষ্টির মঙ্গলের জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থ পদদলিত হউক! বলিয়াছি ত, এবার আমরা একতা মসজিদে ফেলিয়া আসিব না। আমাদের এ মহাব্রতে ঈশ্বর সহায় হউন।

আর এক কথা। এমন শুভদিনে আমরা আমাদের হিন্দু ভ্রাতৃবৃন্দকে ভুলিয়া থাকি কেন? ঈদের দিন হিন্দু-ভাতৃগণ আমাদের সহিত সম্মিলিত হইবেন, এরূপ আশা কি দূরাশা? সমুদয় বঙ্গবাসী একই বঙ্গের সন্তান নহেন কি? অন্ধকার অমানিশার অবসানে যেমন তরুণ অরুণ আসে, তদ্রুপ আমাদের এখানে অভিশাপের পর এখন আশীর্বাদ আসুক; ভাতৃ-বিরোধের স্থানে এখন পবিত্র একতা বিদ্যমান থাকুক। আমীন!

আবার বলি, আজি কি সুখের দিন –আশীর্ব্বাদ ও সুসংবাদ লইয়া শুভ ঈদ আসিয়াছে!!

' src='https://nariblog1da1d.zapwp.com/q:intelligent/retina:false/webp:false/w:1/url:https://nari.blog/wp-content/uploads/2021/04/avatar_user_33_1618065720-85x85.png' srcset='https://nariblog1da1d.zapwp.com/q:intelligent/retina:false/webp:false/w:1/url:https://nari.blog/wp-content/uploads/2021/04/avatar_user_33_1618065720-170x170.png 2x' class='avatar avatar-85 photo' height='85' width='85
লিখেছেন
বেগম রোকেয়া

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন বা বেগম রোকেয়া ছিলেন একজন বাঙালি চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক। তিনি বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত এবং প্রথম বাঙালি নারীবাদী।

সব পোস্ট দেখুন
মন্তব্য করুন

' src='https://nariblog1da1d.zapwp.com/q:intelligent/retina:false/webp:false/w:1/url:https://nari.blog/wp-content/uploads/2021/04/avatar_user_33_1618065720-85x85.png' srcset='https://nariblog1da1d.zapwp.com/q:intelligent/retina:false/webp:false/w:1/url:https://nari.blog/wp-content/uploads/2021/04/avatar_user_33_1618065720-170x170.png 2x' class='avatar avatar-85 photo' height='85' width='85 লিখেছেন বেগম রোকেয়া