নারী ব্লগ

আমাদের সম্পর্কে

“কোন কালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারি ;
প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়েছে, বিজয়লক্ষ্মী নারী।”

কবির এই বিজয় দীপ্ত সত্য-কথনের পরেও সমাজে কি দুর্বিষহ অবস্থান নারীর। জীবনের বাঁকে বাঁকে ওঁৎ পেতে থাকে বিপদ। শান্তিপূর্ণ কিংবা সংকটকালীন- সবসময়ই নির্যাতন-অসম্মানের আশঙ্কা তাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করে। তবু সেই বিপদসংকুল দুনিয়ায় তাকে বাস করতে হয়, বেড়ে উঠতে হয়। ধর্ষণ পুরুষতন্ত্রের আধিপত্যের স্মারক আর নারীর মর্যাদা হানির অন্যতম হাতিয়ার। পুরুষ নারীর উপর তার কর্ত্রিত্ব বজায় রাখতে সৃষ্টি করেছে লিঙ্গ বৈষম্য। যা সকল সমাজেই বিদ্যমান। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং কর্মক্ষেত্রেও নারীরা বৈষম্যের শিকার। বিশেষ অর্থসম্পদ, নীতিনির্ধারণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সকল ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ পুরুষের হাতে থাকায় স্বাভাবিকভাবেই নারীকে অসহায়, ক্ষমতাহীন এবং পরিণতিতে বৈষম্যের শিকার হতে হয়। একটি শিশু স্ত্রীঅঙ্গ নিয়ে জন্মালেও সে জানে না সে নারী না পুরুষ। ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসনের বেড়াজালে তাকে মানুষ হিসেবে নয় মেয়ে হিসেবে তৈরি করে তোলা হয় এবং আরোপ করা হয় সবরকম বিধি-নিষেধ। এতকিছুর পরেও দমে যান না নারী। তারা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও শারীরিক মুক্তির সংগ্রামে বলিয়ান হচ্ছে ক্রমেই। বিশ্বের কিছু জায়গায় নারীরা কিছুটা অধিকার ভোগ করলেও বাংলাদেশে তা একদমই তলানীতে। নারীর প্রকৃত স্বাধীনতা ব্যাতীত একটি সমাজ সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারে না। তাই নারীর শিকল ভাঙ্গার দলে শরীক হতে এই নারী ব্লগ। নারী ব্লগে লিখিত সমস্ত লেখার স্বত্ত এবং এর দায়ভার লেখকের নিজস্ব। তাই নারী ব্লগ এখানে প্রকাশিত কোন লেখা সম্পাদনা করে না এবং এর লেখা সম্পর্কিত কোন মডারেটর নেই।

নারী ব্লগ কি?
ব্লগ শব্দটি ইংরেজি Blog এর প্রতিশব্দ যা এক ধরনের অনলাইন ব্যক্তিগত দিনলিপি বা ব্যক্তি কেন্দ্রিক পত্রিকা। ইংরেজি ব্লগ শব্দটি Weblog এর সংক্ষিপ্ত রূপ। যিনি ব্লগে পোস্ট করেন তাকে ব্লগার বলা হয়। ব্লগাররা প্রতিনিয়ত তাদের ওয়েবসাইটে কনটেন্ট যুক্ত করেন আর ব্যবহারকারীরা সেখানে তাদের মন্তব্য করতে পারেন। এছাড়া সাম্প্রতিক কালে ব্লগ, ফ্রীল্যান্স সাংবাদিকতার একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে । বেশিরভাগ ব্লগ’ই কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কিত খবর জানায়। বাকিগুলো ব্যক্তিগত অনলাইন দিনলিপি। নারী ব্লগ হলো নারীর অধিকার কে মানুষের অধিকার রূপে প্রতিষ্ঠা, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, বৈষম্যের শিকার না হওয়া ,শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার প্রত্যাশা, শিক্ষা ও নিজস্ব সম্পদ সংগ্রহের নিশ্চয়তা, রাজনৈতিক মত প্রকাশের সুব্যবস্থা, শ্রমের সঠিক মূল্যপ্রাপ্তি, সর্বোপরি নারীর আশা- আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ-বেদনার না বলা কথা মালা উপস্থাপনের একটি আদর্শ প্ল্যাটফর্ম।

কেন এই নারী ব্লগ?
যুগে যুগে নারীর ত্যাগ, ভালোবাসা ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে। যুদ্ধে, প্রতিবাদে, অধিকার আদায়ও পিছিয়ে নেই নারী। অন্য পিঠে অবহেলা, নির্যাতন, লাঞ্ছনা আর অপমানেরও রয়েছে লিখিত- অলিখিত ইতিহাস। এত ভালোবাসা এত মমতায় ভরা নারীর রয়েছে মা হবার ক্ষমতা; সেই নারীর শ্রেষ্ঠ গুণ দিয়ে বদলে দেয়া যায় পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র তথা পুরো পৃথিবী। নারীর ক্ষমতা কে শক্তিতে পরিণত করার হাতিয়ার হতে পারে এই নারী ব্লগ। ডিজিটাল যুগের লেখালেখি আর প্রিন্ট মিডিয়ার উপর নির্ভরশীল নয়। তাই চাইলেই যে কেউ নারী ব্লগে নিজের মুক্তচিন্তার প্রকাশ ঘটাতে পারেন। নারীর মত প্রকাশের চমৎকার মাধ্যম এটি। নারীর ব্যক্তিগত ডায়েরির অনলাইন সংস্করণ।

যুগ যুগ ধরে মনে করা হয় নারী শারীরিকভাবে দুর্বল। জন্ম থেকে নারীকে এই বিশ্বাস এজন্যই দেওয়া হয় যেন তার উপর জোর খাটানো সহজ হয়। অথচ যে কোন শারীরিক কাজের জন্য নারী নিজেকে প্রস্তুত করতে পারেন, তার প্রমাণ আছে বিশ্বজুড়ে। আমাদের দেশে কৃষি, নির্মাণ শিল্প, তৈরি পোশাক শিল্পে নারীর ব্যাপক উপস্থিতি সেই কথাই বলে। নারীর বিবেচনাবোধ নিয়েও সংশয় থাকে। তাই তো মাত্র একবিংশ শতাব্দিতে এসে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার মতের তোয়াক্কা করার কথা ভাবা হয়। ১৮৯৩ সালে নিউজিল্যান্ডের নারীরা প্রথম জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা সে অধিকার পান ১৯২০ সালে এবং ফ্রান্সের ১৯৪৪ সালে।তবে এত বছর চেষ্টা করলেও বিশ্বের সব খানে নারীর রাজনৈতিক মতামতের মূল্য এখনো নেই। সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা কার্যক্রম থেকে নারীকে বাদ দেওয়া হয়েছে; পাকিস্তানের কিছু স্থানে এখনো নারীর ভোট দেওয়া নিষিদ্ধ। অন্যদিকে আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক শক্তির কবল থেকে মুক্তি পেতে নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হওয়ার আগেই ভোট দেওয়ার অধিকার অর্জন করেছেন। কিন্তু আফ্রিকাসহ পৃথিবীর কোথাও নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি পুরোপুরিভাবে ঘটেনি। নারীরা পরিবার এবং মোটাদাগে চেনা সমাজ পদে-পদে তাকে অর্থনৈতিক মুক্তির স্বাদ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।

এসব প্রতিকূলতার মাঝখানে নারী যখন সামান্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চান তখন স্থান ও সংস্কৃতিভেদে বাল্যবিবাহ,ধর্ষণ ,অনিচ্ছাকৃত সন্তানধারণ এসবের সঙ্গে সমসাময়িককালে যোগ হয় জবরদস্তিমূলকভাবে কন্যা শিশু ভ্রূণ হত্যা ।এইডস কিংবা পাচার। প্রকৃতপক্ষে, নারী নিজের শরীরের ওপরেও অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না। ফলে নারীর অর্থনৈতিক শৃংখল ও সামাজিক নিগ্রহের উর্ধ্বে ওঠা হয়না। আর সে কারণেই যুগ যুগ ধরে নারী অধিকার আন্দোলনে তার অর্থনৈতিক মুক্তি ও সমাজে পুরুষের সমান গ্রহণযোগ্যতা বিশেষ করে শ্রমিকদের ক্ষেত্রে পুরুষের সমান হওয়ার লড়াই চলে। বস্তুত এই অধিকারগুলো নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নারীর নিজের শরীরের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।

উপরন্তু নারীর মুক্তি এক অর্থে গণতন্ত্রের মুক্তি। গণতন্ত্রে লিঙ্গ-জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার প্রতি সমতা বিধান কে লক্ষ্য ধরে নেওয়া হয়। নারী যতদিন পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুরুষের অধঃস্তন থাকবেন ততদিন দেশে কিংবা রাস্ট্রে গণতন্ত্রের চর্চা সম্ভব নয়। পৃথিবীতে অন্তত ২২ টি দেশ নারীর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। অভিন্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতিতে নারী ও পুরুষ একই মাত্রার যোগ্যতার পরিচয় দিতে সক্ষম। ক্ষুদ্র থেকে জাতীয় যে কোনো পরিসরে নারী নিজেকে বারবার প্রমাণ করার পরও বর্তমানে রাষ্ট্রপরিচালনায় কেবল ২৫% আসনে নারীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। যেহেতু নেতৃত্ত্বের অবস্থানে তথা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি কম, তাই আইন-কানুন প্রণয়নে তাদের জরুরী প্রয়োজন গুরুত্ব পায় না। ধারণা করা হয় ক্ষমতা পরিচালনায় নারীর উপস্থিতি একই হারে ক্রমবর্ধমান থাকলে সমতা আসতে আরও ১৩০ বছর লেগে যাবে। নারীর প্রতি নির্ভরতার অভাবজনিত পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা তার ক্ষমতায়নে প্রধান বাধা। অন্যদিকে মুক্তবাজার অর্থনীতি কেবল মুনাফার উপরে মনোনিবেশ করে।

এমতাবস্থায়, সাধারণ দ্রব্য উৎপাদনের কারখানা থেকে শুরু করে সৃষ্টিশীল প্রতিটি ব্যবসায় পুরুষের তুলনায় নারীকে শ্রমের মূল্য কম প্রদান করে মুনাফা বাড়াতে চায়। সে দিক থেকে বিবেচনা করলে পুরুষ তন্ত্র ও পুঁজিবাদ দুই-ই নারীর মুক্তির অন্তরায়।

এইসব বঞ্চনার কথামালার সাহসী উচ্চারণ নারী ব্লগ। আসুন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে কবির কন্ঠে গলা মিলিয়ে সমস্বরে বলি-

“পৃথিবীর যা কিছু মহৎ সৃষ্টি,
চির কল্যানকর।
অর্ধেক তার গড়িয়াছে নারী
অর্ধেক তার নর।”